মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের এক বছর
ছবি: সংগৃহীত

ঠিক এক বছর আগের আজকের এই দিনটি (২১ জুলাই ২০২৫) পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিভে গিয়েছিল ৩৮টি তাজা প্রাণ, আর আগুনের লেলহান শিখায় ছাই হয়ে গিয়েছিল শত শত স্বপ্ন।

এক বছর পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালের ২১ জুলাই এসেও সেই আগুনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন বেঁচে থাকা ৬৩ জন আহত শিক্ষার্থী ও মানুষ। কারও শরীর বিকৃত, কারও সামনে ঝুলছে একের পর এক অস্ত্রোপচারের অনিশ্চয়তা।

কিন্তু সবচেয়ে বড় হতাশার কথা—ঘটনার এক বছর পার হলেও তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী হতাহতদের পরিবার আজও পায়নি কাঙ্ক্ষিত কোনো ক্ষতিপূরণ!

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দুর্ঘটনাস্থল ও পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৩৮ জন। আশঙ্কাজনক অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন ৬৩ জন।

‘শ্বাসনালি দগ্ধ হওয়াটাই মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল’

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট জানায়, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে প্রথম তারা দুর্ঘটনার খবর পায় এবং তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করে।

সংস্থায় চিকিৎসাধীন থাকা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, আহতদের অধিকাংশই ফ্লেম বার্ন (সরাসরি আগুন) এবং ইনহেলেশন বার্নে (ধোঁয়া ও তাপে শ্বাসনালি দগ্ধ হওয়া) আক্রান্ত ছিলেন। দুর্ঘটনাটি স্কুল ভবনের আবদ্ধ ঘরের ভেতরে ঘটায় শিক্ষার্থীরা বাইরে বের হতে পারেনি। ফলে বাতাসে অক্সিজেনের বদলে আগুনের উত্তপ্ত ধোঁয়া তাদের ফুসফুসে ঢুকে যায়। এই শ্বাসনালি মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়াই চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের এক বছর
ছবি: সংগৃহীত

বাজেটেও বরাদ্দের হদিস নেই, চরম আর্থিক সংকটে পরিবারগুলো

দুর্ঘটনায় শরীরের ৫২ শতাংশ পুড়ে যাওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত ৯৭ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ঘরে ফিরেছে। কিন্তু জীবন স্বাভাবিক হয়নি।

দীপ্তকে প্রতি মাসেই নিতে হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ফিজিক্যাল থেরাপি ও ইনটেনসিভ চিকিৎসা। দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘সন্তানের এই অবস্থার পর থেকে চিকিৎসা ও যাতায়াত বাবদ আমাদের সংসারের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কারও কাছ থেকেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা আমরা পাইনি।’

একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের বাবা নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘সন্তান হারানোর ক্ষতি কোনো টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু তদন্ত কমিশন সরকারের কাছে যে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিল, তার একটি টাকাও এক বছরে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।’

জানা গেছে, মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে নিহতদের ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কমিশনের সুপারিশের তুলনায় এটি অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় স্বজনরা সেই অর্থ প্রত্যাখ্যান করেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা নুরুন্নবী বলেন, ‘আহতদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসা রাষ্ট্রের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।’

তদন্ত কমিশনের সুপারিশ ও সরকারি স্থবিরতা

দুর্ঘটনার পর গঠিত বিচার বিভাগীয় ও বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ কাঠামোর সুপারিশ করেছিল:

  • নিহত শিশুর পরিবার: ১ কোটি টাকা (প্রতিজন)
  • নিহত প্রাপ্তবয়স্কের পরিবার: ৮০ লাখ টাকা (প্রতিজন)
  • গুরুতর আহত শিশু: ৬০ লাখ টাকা (পুনর্বাসনসহ)
  • মাঝারি ও কম আহত শিশু: ৩০ লাখ এবং ১৫ লাখ টাকা
  • গুরুতর আহত প্রাপ্তবয়স্ক: ৪০ লাখ টাকা

এমনকি বার্ন ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য আলাদা বাজেটের সুপারিশ করা হলেও নতুন অর্থবছরের সরকারি বাজেটে এ বিষয়ে কোনো পৃথক অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কমিশন অত্যন্ত মানবিক ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এই স্পষ্ট সুপারিশ জমা দিয়েছিল। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সূত্রঃ সমকাল