সৌদি আরবের মক্কায় অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। নিহতদের একজন টাঙ্গাইলের সিতি বা সুইটি আক্তার, অন্যজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির।
ঘটনাটি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ সরকার, জেদ্দা কনস্যুলেট এবং দুই পরিবারকে কেন জানানো হয়নি।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর জানায়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পরে আদালতের রায় বহাল থাকে এবং রাজকীয় অনুমোদনের পর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডের আগে পরিবারের শেষ কথা
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নগর ছাওয়ালী গ্রামের সুইটি আক্তারের পরিবার জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের দিন অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর মাগরিবের নামাজের পর মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়।
তখন সুইটি মাকে জানান, আরও দুই মাস পর দেশে ফিরবেন।
সুইটির মা জহুরা বেগম বলেন, “আমার সুইটিরে আইনা দাও তোমরা। বাইচ্চা থাক বা মইরা যাক, আমার মেয়েরে আমার কাছে আন।” সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার মেয়ের পরিণতি নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছে।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় মেয়ে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলত। এক পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ এক বছর পর আবার যোগাযোগ হয় এবং প্রায় চার মাস চলার পর আবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সুইটির সৌদি যাত্রা ও গ্রেপ্তার
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে ২০২৩ সালে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। স্থানীয় এক দালালকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়।
সেখানে মক্কার আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরিবার জানায়, গ্রেপ্তারের খবর তারা জানতে পারে প্রায় এক বছর পর। সুইটি ফোনে প্রথমে বলেছিলেন, মারামারির মামলায় তাঁকে আটক করা হয়েছে।
কিন্তু সৌদিতে থাকা এক বান্ধবী পরিবারকে জানান, এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নজরুলের পরিবারও অনেক কিছু জানেনি
নজরুল ইসলাম আবদুল বাসিরের পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান।
সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা পরিবার জানতে পারেনি।
স্বজনদের দাবি, নজরুল প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি ছিলেন। এরপর ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
স্বামী স্ত্রী দাবি নিয়ে বিরোধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ও সুইটিকে স্বামী স্ত্রী বলে দাবি করা হলেও নজরুলের বাবা আবদুল বাছির জানিয়েছেন, তাঁরা স্বামী স্ত্রী নন এবং সুইটিকে তারা চেনেন না।
অন্যদিকে সুইটির পরিবার বলছে, তাঁর প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল। সেই স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানো হলেও কিছুদিন পর তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
সৌদির পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি বা সুইটি আক্তারকে মক্কার একটি মসজিদে অশালীন কাজ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেয়, সর্বোচ্চ আদালত রায় বহাল রাখে এবং রাজকীয় আদেশের পর ১৪ অক্টোবর দণ্ড কার্যকর হয়।
সৌদি পক্ষ বলেছে, শাস্তি দেওয়া হয়েছে কারণ তাঁদের কাজ সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের গুরুতরতা বহন করে।
তবে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, প্রমাণ, মামলার তারিখ বা পূর্ণ রায় প্রকাশ করা হয়নি।
দূতাবাস কেন জানেনি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা কোনো নোটিফিকেশন পায়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ঢাকা বিষয়টি জানতে পারে ১৪ অক্টোবর, অর্থাৎ দণ্ড কার্যকরের দিনই।
জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় দফতরে নোট ভার্বেল পাঠিয়ে বিষয়টির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চেয়েছে।
ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতকেও ডেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ সরকার বা দূতাবাসকে কেন জানানো হয়নি।
তবে এখন পর্যন্ত সৌদি পক্ষ থেকে কেন আগাম জানানো হয়নি, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিনের বিচারপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি কনস্যুলার কর্তৃপক্ষ কতটা জড়িত ছিল, আসামিদের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং মৃত্যুদণ্ডের আগে পরিবারকে জানানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না।
যেসব রহস্য এখনো রয়ে গেছে
এই মামলায় এখনো কয়েকটি বড় প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
- অভিযোগের সুনির্দিষ্ট রূপ কী, তা সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।
- গ্রেপ্তারের সঠিক সময় ও কারণ নিয়ে দুই পরিবারের বক্তব্যে স্পষ্ট তথ্য নেই।
- মামলার পূর্ণ রায় ও আদালতের প্রক্রিয়া এখনো প্রকাশ পায়নি।
- আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পেরেছিলেন কি না, তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ব্যাখ্যা চেয়েছে।
- পরিবার ও কনস্যুলেট কেন দীর্ঘদিন অবহিত ছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
- দুজনের সম্পর্ক আসলে কী ছিল, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি ছড়ালেও পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
মির্জাপুর থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে খবর ছড়ানোর পর সুইটির বাড়িতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, সরকারিভাবে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনে খোঁজ নেওয়া হবে।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, সুইটি জীবিত থাকলে তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য
- ১৪ অক্টোবর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর নিশ্চিত করে।
- নিহতদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি বা সুইটি আক্তার।
- অভিযোগ ছিল মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক বা অশালীন কাজ করা।
- মৃত্যুদণ্ড তাজির আইনে দেওয়া হয় এবং সর্বোচ্চ আদালতে তা বহাল থাকে।
- বাংলাদেশ সরকার ও জেদ্দা কনস্যুলেট বলছে, আগাম জানানো হয়নি।
- দুই পরিবারই বলছে, তারা বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আগাম জানত না।
সতর্কতা
মসজিদে চুম্বন করায় মৃত্যুদণ্ড শিরোনামে অনেক পোস্ট ছড়িয়েছে, কিন্তু সৌদি সরকার এ ধরনের নির্দিষ্ট বিবরণ দেয়নি। তাই এটিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত দাবি হিসেবে উল্লেখ করা উচিত, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়।
বাংলাদেশ সরকার আগেও প্রবাসীদের মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও রক্তের ক্ষতিপূরণের পথ ব্যবহার করেছে। তবে সৌদি আরবে নিহতের পরিবার ক্ষমা না করলে বা রায় কার্যকর হয়ে গেলে সেই সুযোগ আর থাকে না।
তথ্যসূত্র
https://apnews.com/article/03d81c6dd9cf107482392105c21fc1e4
https://www.bbc.com/news/articles/cmde83w13p00o
https://en.prothomalo.com/bangladesh/c46yja4lqj
https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/n3x4d3ovdb
https://www.bssnews.net/news/435991
https://www.thedailystar.net/opinion/editorial/news/riyadh-owes-dhaka-clear-explanation-4300936














