নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩০৮ জনে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫,৬২৪ জন।
দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চলছে। এর মধ্যে ভয়াবহ বন্যার ৯ দিন পর নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যা উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সর্বশেষ হতাহত ও নিখোঁজের চিত্র
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নেপাল সরকারের তথ্যের ভিত্তিতে তুরস্কভিত্তিক আনাদোলু এজেন্সি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, নেপালে নিহত হয়েছেন ১,২৮৭ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫,০৮৩ জন।
অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে (শিজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল) নিহতের সংখ্যা ২১ এবং নিখোঁজ ৫৪১ জন। দুই অঞ্চল মিলিয়ে মোট নিহত ১,৩০৮ ও নিখোঁজ ৫,৬২৪ জন।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। নেপালের হিসাবে অন্তত ৫৮৩ বিদেশি নাগরিক এখনো নিখোঁজ।
তাদের অনেকেই ছিলেন পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তি। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, উভয় পাশ মিলিয়ে মোট ৮৪৪ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার
ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী আপার ত্রিশুলি-৩এ (Trishuli 3A) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে শুক্রবার দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
তারা হলেন-মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ (৩০) এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহারজন (৪৫)। প্রায় ১৭০ মিটার গভীর সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকর্মীরা প্রথমে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের আওয়াজ শুনতে পান। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়। উদ্ধারের পর সঞ্জয় সাহকে মাটিতে আচ্ছাদিত অবস্থায় উদ্ধার তাঁবুতে নেওয়া হয়।
আরো পড়ুন- তিব্বত বন্যা: ২৩ দেশের ২৬১ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ, মৃত ১৬
সেখানে সেনাবাহিনীর চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন এবং অক্সিজেন দেন। তার আঘাত গুরুতর নয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কবির মহারজন হাত-পা নাড়াতে পারছিলেন না। দুজনকেই পরে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই দুই শ্রমিকের উদ্ধারে নতুন করে আশার আলো দেখছেন উদ্ধারকর্মীরা। ত্রিশুলি নদী অববাহিকার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে এখনো কয়েকশ মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালে অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযান ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও তল্লাশি ও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছেন। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী যন্ত্রপাতি।
একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভেতরে জীবিত মানুষের সন্ধানে চলছে প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি।
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্নির্মাণ চ্যালেঞ্জ
দুর্যোগে নেপালের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৭,৫০০ ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০,০০০ ঘর পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে।
অবকাঠামো, আবাসন ও সম্পত্তি মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮৭.৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি বা ২.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগের সূত্রপাত ও প্রভাব
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। নেপালের লাংটাং অঞ্চলের একটি হিমবাহ ও পাহাড়ি অংশ ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে।
এতে ত্রিশুলি ও ভোতে কোশি নদীর পানির প্রবাহ ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে নদীতীরবর্তী জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্লাবিত ও বিধ্বস্ত হয়।
দুর্যোগের প্রভাব নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বতেও পড়ে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এরপর থেকেই নিখোঁজদের সন্ধানে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে।










