রাজধানীর গুলশানের মতো এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল কোনো নতুন খবর নয়। রাতের বেলা গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র যাচাই করা, সন্দেহজনক গতিবিধি পরীক্ষা করা, এসবই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক অংশ।
কিন্তু এই স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন কর্মকর্তাকে যখন ফোনে হুমকি শুনতে হয়, “আপনি জানেন কার সঙ্গে কথা বলছেন?”, তখন বোঝা যায় সমস্যাটা আসলে কতটা গভীরে।
গুলশানে দায়িত্ব পালন ও ক্ষমতার দাপট
এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বেও গুলশান বিভাগের একজন উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়মিত অভিযানের সময় একটি প্রাইভেট কার তল্লাশি করতে গিয়ে একই ধরনের হুমকির মুখে পড়েছিলেন।
গাড়িতে থাকা ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রভাবশালী পরিচয়ের ইঙ্গিত দিয়ে তাকে সতর্ক করার চেষ্টা হয়েছিল বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
কিছুদিনের মধ্যেই সেই কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনকে বদলি করা হয়।
দুটি ঘটনার মধ্যে প্রশাসনিকভাবে সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য জনসমক্ষে নেই।
কিন্তু সময়ের এই সমাপতন এমন একটা ধারণা তৈরি করে দেয়, যা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই ক্ষতিকর।
আইনের শাসন নাকি বদলির নাটক?
প্রশ্নটা এখানেই। একজন কর্মকর্তা যখন আইন অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব পালন করেন, আর সেই দায়িত্ব পালনের কারণে তাকে হুমকি শুনতে হয়, তখন রাষ্ট্রের উচিত সেই হুমকির উৎস খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
অথচ বাস্তবতা প্রায়ই উল্টো পথে হাঁটে। হুমকিদাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাকেই সরিয়ে দেওয়া হয়, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো প্রশাসনিক রুটিন কাজের আড়ালে।
এতে স্বল্পমেয়াদে হয়তো একটা “শান্তি” বজায় থাকে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যে বার্তা ছড়িয়ে পড়ে তা মারাত্মক। বার্তাটা হলো, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে আইনের হাত থেকে বাঁচার একটা পথ থেকেই যায়।
মোহাম্মদপুর কি চিরস্থায়ী সন্ত্রাসের জনপদ?
আস্থার সংকট ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মকর্তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছেন, এটাই চাকরির নিয়ম।
সমস্যা বদলিতে নয়, সমস্যা হলো যখন একটি নির্দিষ্ট বদলির সময়টা এমন একটা ঘটনার সঙ্গে মিলে যায় যে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়।
আর যখন এই ধরনের সন্দেহ বারবার তৈরি হতে থাকে, তখন প্রশাসনের প্রতিটি রুটিন সিদ্ধান্তই মানুষের চোখে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।
এই আস্থার সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব প্রশাসনের নিজের, আর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বচ্ছতা।
- যদি কোনো বদলি সত্যিকার অর্থেই রুটিন প্রক্রিয়ার অংশ হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে দেওয়া উচিত।
- আর যদি হুমকির অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত পুরোপুরি স্বাধীনভাবে, যাতে কেউ প্রভাব খাটাতে না পারে।
গভীরে শিকড় গেড়ে থাকা তদবির সংস্কৃতি
তদবির সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কখনো থামেনি।
থানায় একটি সাধারণ অভিযোগ থেকে শুরু করে বড় কোনো অভিযান পর্যন্ত, প্রতিটি স্তরে কারো না কারো ফোন আসে, কারো না কারো পরিচয় সামনে আনা হয়।
কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো সন্ত্রাসীদের বা গডফাদারের পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক উচ্চ পদস্থ কারো পরিচয় বা নাম ভাঙ্গানো।
এই বাস্তবতা পুলিশের সাধারণ সদস্যদের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে।
একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা যখন প্রশিক্ষণ শেষ করে মাঠে নামেন, তিনি শেখেন আইন কী বলে।
কিন্তু বাস্তবে তাকে শিখতে হয় কার ফোন এলে থেমে যেতে হয়, আর কার কথা উপেক্ষা করা যায়। এই দ্বিমুখী শিক্ষা একটি প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
দায়বদ্ধতা ও আইনি কাঠামোর অভাব
এখানে প্রশ্ন ওঠে দায়বদ্ধতার। যে বা যারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আইন প্রয়োগে বাধা দেন,
তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কাঠামো কি আমাদের আছে?
থানা পর্যায়ে হুমকির অভিযোগ পেলে তা লিপিবদ্ধ করার এবং স্বাধীনভাবে তদন্তের একটা সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া থাকা দরকার,
যেখানে হুমকিদাতার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তদন্তের গতি একই রকম থাকবে।
এই মুহূর্তে এমন কোনো সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
ফলে প্রতিটি ঘটনার পর একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, ব্যবস্থা নেওয়া হলো কার বিরুদ্ধে, আর কেন।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ও সামাজিক দায়িত্ব
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনাকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করার এখতিয়ার সংবাদমাধ্যমের নেই, সেটা আদালতের কাজ।
কিন্তু প্রশ্ন তোলা, প্যাটার্ন চিহ্নিত করা এবং জনগণের সামনে বিষয়টি তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
যখন একের পর এক এই ধরনের ঘটনা সামনে আসে, তখন নীরব থাকাটাই বরং দায়িত্বহীনতা।
প্রশাসনের উচিত এই ধরনের প্রশ্নকে আক্রমণ হিসেবে না দেখে বরং নিজেদের স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটা সুযোগ হিসেবে দেখা।
এই বদলির চক্র ভাঙতে করণীয়
এই সংস্কৃতি বদলানোর কাজটা রাতারাতি সম্ভব নয়, তা মানতেই হবে। কিন্তু কিছু পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া যায়।
- দায়িত্ব পালনরত কোনো কর্মকর্তা হুমকির শিকার হলে সেই অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে লিপিবদ্ধ করার এবং স্বতন্ত্র তদন্তের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।
- কোনো বদলি যদি কোনো স্পর্শকাতর ঘটনার কাছাকাছি সময়ে হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করার একটা স্বচ্ছ পদ্ধতি থাকা উচিত, যাতে জনমনে অহেতুক সন্দেহ তৈরি না হয়।
- যারা প্রকৃতপক্ষে সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়ার একটা প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দরকার, যাতে তারা কোনো প্রভাবশালী পরিচয়ের সামনে পিছিয়ে না যান।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা একটাই। রাষ্ট্র কাকে সুরক্ষা দেবে, যে আইন মেনে দায়িত্ব পালন করে, নাকি যে ক্ষমতার পরিচয় দেখিয়ে আইনকে থামিয়ে দিতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন স্পষ্ট না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনের প্রতি আস্থার ঘাটতি থেকেই যাবে।
আর একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি যে তার প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা, সেটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।
–মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক













