মোহাম্মদপুর সন্ত্রাস ও গ্যাং কালচার সম্পাদকীয়

ঢাকার হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত মোহাম্মদপুর আজ আর বছিলা ব্রিজের স্নিগ্ধ বাতাস কিংবা সাত গম্বুজ মসজিদের আভিজাত্যের জন্য পরিচিত নয়। বরং এটি এখন এক আতঙ্কের নাম।

বিগত কয়েক দশকে এলাকাটি যে পরিকল্পিতভাবে এক অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, তা সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য গবেষণার বিষয় হতে পারে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ষাটের দশকে আইয়ুব খানের আমলে ‘মোহনপুর’ থেকে ‘মোহাম্মদপুর’ নামকরণের মাধ্যমে যে ধর্মীয় রাজনীতির বীজ বপন করা হয়েছিল, আজ তা এক মহীরুহে পরিণত হয়ে সাধারণ মানুষের টুঁটি চেপে ধরেছে।

ভূমিদস্যুতা ও ধর্মের বর্ম

মোহাম্মদপুরের ভূ-প্রকৃতি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের কোলঘেঁষা। এই ভৌগোলিক সুবিধাকেই কাল হিসেবে বেছে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সরকারি খাস জমি, খাল ও নদীর পাড় দখল করার জন্য এখানে যে কৌশলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তা হলো—প্রথমে একটি নামকাওয়াস্তে মসজিদ বা মাদ্রাসা স্থাপন।

ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই দখলবাজিকে বৈধতা দেওয়া হয়। এরপর সেখানে গড়ে ওঠে অবৈধ আবাসন প্রকল্প। আর এই বিশাল সাম্রাজ্য পাহারা দিতেই আশির দশক থেকে লালন-পালন করা হয়েছে ভয়ংকর সব লাঠিয়াল বাহিনী। আজকের জোসেফ, পিচ্চি হেলাল কিংবা হাল আমলের ‘গ্যাঞ্চিল’ বাহিনীর উত্থান মূলত এই জমি দখলের রাজনীতির ফসল।

জেনেভা ক্যাম্প ও মাদকের স্বর্গরাজ্য

মোহাম্মদপুরের অস্থিরতার একটি বড় উৎস হলো জেনেভা ক্যাম্প বা বিহারী ক্যাম্প। স্বাধীনতার পর মানবিক কারণে গড়ে তোলা এই অস্থায়ী আবাস আজ মাদকের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে।

এখানকার ঘিঞ্জি পরিবেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির মাদক ব্যবসায়ী গোটা ঢাকার বিষ সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে একে। ক্যাম্পের ভেতরের কোন্দল আর মাদকের নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই রাজপথে চলে আসে, যার বলি হয় সাধারণ পথচারী।

আরো পড়তে পারেন- ভিউয়ের দৌড়ে সাংবাদিকতার অবনতি

১০৫ জনের কাছে জিম্মি ১০ লাখ প্রাণ

পুলিশের হিসাবে মোহাম্মদপুরে বর্তমানে ৫০টি ছোট-বড় গ্যাং সক্রিয়, যার মধ্যে ১৭টি গ্যাং সরাসরি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল জনপদে সক্রিয় সন্ত্রাসীর সংখ্যা মাত্র ১০৫ জন।

অর্থাৎ ১০ লাখ মানুষের নিরাপত্তা আজ মাত্র একশ’ জন ছিঁচকে ও পেশাদার অপরাধীর হাতে বন্দি। এদের নামগুলো শুনলে হাস্যকর মনে হলেও তাদের কর্মকাণ্ড বিভীষিকাময়:

  • ডাইল্লা গ্রুপ ও ল ঠেলা: এরা মূলত এলাকাভিত্তিক কিশোর ও যুবকদের মগজ ধোলাই করে মাদক ও ছিনতাইয়ে নিয়োজিত করে।
  • অ্যালেক্স ও টক্কর ল: এদের কাজ হলো আবাসন ব্যবসায়ীদের হয়ে ভাড়াটে হিসেবে জমি দখল বা উচ্ছেদ করা।
  • গাঞ্চিল বাহিনী: বেড়িবাঁধ ও নদী কেন্দ্রিক অপরাধের রাজা এরা।

৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মোহাম্মদপুরের ভাগ্য বদলায়নি। গত ২০ মাসে দিনে-দুপুরে ২৪টি খুনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের কাছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নখদন্তহীন।

রাজনৈতিক দলগুলো যখনই ক্ষমতায় আসে, তারা এই সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে নিজেদের ‘পেশীশক্তি’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বর্তমানে ১৭টি বড় গ্রুপের মধ্যে ১২টিই ক্ষমতার ছায়াতলে থেকে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

সিটি নির্বাচন ও নতুন শঙ্কা

সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ার্ড দখল আর ভোট কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের জন্য আবারও এই গ্যাংগুলোর ডাক পড়বে। সম্প্রতি ‘অ্যালেক্স ইমন’ খুন হওয়া বা গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব আসলে এই আগাম আধিপত্য বিস্তারেরই লক্ষণ।

সন্ত্রাসীদের এই রাজনৈতিক লাইসেন্স যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন মোহাম্মদপুরবাসী নিরাপদ হতে পারবেন না।

মুক্তি কোথায়?

প্রশাসনের নির্লিপ্ততা আর দুর্বল চার্জশিটের সুযোগে সন্ত্রাসীরা বারবার কারাগার থেকে ফিরে এসে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হবে।

এখন সময় এসেছে সামাজিক প্রতিরোধের। পাড়ায় পাড়ায় নাগরিক কমিটি গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন যেন তারা কোনো দাগি অপরাধীকে আশ্রয় না দেয়।

মোহাম্মদপুরকে এই ‘গ্যাং কালচার’ থেকে মুক্ত করতে না পারলে রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনোদিনই নিশ্ছিদ্র হবে না। আমরা চাই না মোহাম্মদপুর কেবল অপরাধীদের আস্তানা হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকুক; আমরা চাই এই জনপদ ফিরে পাক তার আদি গৌরব ও নাগরিক শান্তি।

— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক