Home অপরাধ ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সিন্ডিকেট: শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সিন্ডিকেট: শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও নেতাদের নিয়ন্ত্রণ: আগস্ট অভ্যুত্থানের পর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে অপরাধ জগৎ!

263
0

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছে এক নতুন ও বিপজ্জনক সমীকরণ।

৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা আন্ডারওয়ার্ল্ডের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন শুধু চাঁদাবাজি নয়, বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয়।

তাদের এই ক্ষমতা প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় জনমনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

রাজনৈতিক আশ্রয় ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ: আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেপথ্য শক্তি

পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছে।

  • রাজনৈতিক আশ্রয়: কারামুক্তির পর এসব সন্ত্রাসী শুধুমাত্র নিজেদের পেশাদারিত্বের ওপর নির্ভর করছে না, বরং প্রশাসনের একটি অংশের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সরাসরি ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ (Political Patronage) পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আশ্রয়ের কারণেই তারা প্রকাশ্যে হুমকি-চাঁদাবাজি করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
  • নেতাদের নিয়ন্ত্রণ: পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায়, এখন শুধু সন্ত্রাসীরা চাঁদা চাইছে না; অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় ও মাঝারি সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে (Controlling Politicians)। বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, এবং অবৈধ সম্পদ দখলের জন্য তারা রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করছে, যা রাজনীতিক-অপরাধী আঁতাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ব্যবস্থার নীরবতা: শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ

বিশ্লেষক মহল এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই নতুন উত্থান কেবল রাজনৈতিক আশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে ব্যবস্থাগত নীরবতা (Systemic Silence) এবং গুরুতর আর্থিক লেনদেন।

১. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা: অভিযোগ রয়েছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য বা শক্তিশালী কারণে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। অনেকে এই নিষ্ক্রিয়তাকে সরাসরি যোগসাজশ (Complicity) হিসেবে দেখছেন, যার ফলে সন্ত্রাসীরা নির্ভয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

২. আর্থিক লেনদেন ও সুবিধাভোগ: একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের কিছু অংশকে নিয়মিতভাবে আর্থিক সুবিধা (Financial Benefits) প্রদান করে আসছে। চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও অন্যান্য অবৈধ আয়ের একটি অংশ নিয়মিতভাবে উচ্চ মহলে পৌঁছে যায়। এর বিনিময়ে তারা হয় আইনগত সুরক্ষা বা অন্ততপক্ষে তাদের অপরাধমূলক কাজে ‘গ্রিন সিগনাল’ (সবুজ সংকেত) পায়।

নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা স্থানীয় চক্রগুলো তাদের রাজত্ব ছাড়তে নারাজ। এর ফলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে স্থানীয় চক্রগুলোর সংঘাতে রাজধানী জুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা, ঘটছে হুমকি এবং হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় যাদের নাম উঠে আসছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সাজিদুল ইসলাম ইমন, পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ফ্রিডম রাসু, ফ্রিডম সোহেল, হাবিবুর রহমান তাজ সহ অনেকে।

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সিন্ডিকেট

সন্ত্রাসীনিয়ন্ত্রিত এলাকা (অভিযোগ অনুযায়ী)
সাজিদুল ইসলাম ইমননিউ মার্কেট, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ
পিচ্চি হেলালআদাবর, মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর
কিলার আব্বাসকাফরুল, ভাষানটেক ও ক্যান্টোনমেন্ট সংলগ্ন এলাকা
জিসান (বিদেশে)মতিঝিল, শাহজাহানপুর ও সবুজবাগ
মোল্লা মাসুদতেজগাঁওয়ের আবাসিক ও শিল্পাঞ্চল
সুব্রত বাইনহাতির ঝিল, স্কাটন ও মগবাজার

পুলিশে মনোবল ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের শঙ্কার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপি জানিয়েছে, তারা জনগণের জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ এই মুহূর্তে ‘হারানো মনোবল’ এবং ঘন ঘন বদলির কারণে দুর্বল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে:

💬 বিশেষজ্ঞের মন্তব্য: “আইন প্রয়োগের শক্তি দুর্বল হলে অপরাধ বাড়বেই। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক ছায়া। যে পর্যন্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে, সে পর্যন্ত শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগে এই রাজনৈতিক-অপরাধী আঁতাত ভাঙতে হবে। লুট হওয়া হাজার হাজার অস্ত্রও এখনো ফেরত আসেনি,” মন্তব্য করেন একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

চাপের মুখে ব্যবসায়ী মহল

বিদেশী নম্বর থেকে ফোন দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, এবং নির্দিষ্ট জমি জোর করে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।

এই পরিস্থিতিতে, ব্যবসায়ী মহল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন।

তথ্যসূত্রঃডিবিসি নিউজ