শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

ঢাকার মিরপুর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আকতারকে ডেকে নিয়ে পাশবিক ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনা বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও বিচার ব্যবস্থার মুখে এক সজোরে চপেটাঘাত। ১৯ মে ২০২৬-এর সেই কালরাতে যে পৈশাচিকতা ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং তা আমাদের ভেঙে পড়া সামাজিক সুরক্ষাবলয় ও দীর্ঘসূত্রতার বিচারহীনতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, আগামী ১ জুন ২০২৬ থেকেই এই মামলার বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় একে একটি “রেফারেন্স পয়েন্ট” হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।

কিন্তু নাগরিক হিসেবে আজ আমাদের বুক ফুলিয়ে উল্লাস করার সময় নয়, বরং মেরুদণ্ড সোজা করে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে: আদালত কি কেবল রামিসার ঘাতকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, নাকি আমাদের পুরো আইনি ব্যবস্থার ভুল, পঙ্গু থানা-সংস্কৃতি এবং শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো মহামারি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনবে?

রামিসা মামলা: বুলেটের গতি বনাম সাধারণের নিয়তি

ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে মূল হোতা ও ধর্ষক সোহেল রানা গ্রেপ্তার হওয়া এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও চার্জশিট দাখিল সম্পন্ন হওয়া প্রমাণ করে-রাষ্ট্র চাইলে কী না পারে! এই ‘বুলেট গতি’র তদন্ত ও চার্জশিট অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।

কিন্তু মুদ্রার ওপিঠটা বড়ই নির্মম ও বৈষম্যমূলক। আজ সচেতন মহলে এই প্রশ্ন ওঠা অবান্তর নয় যে-রামিসার এই পৈশাচিক ট্র্যাজেডি যদি গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন না জ্বালাত, তবে কি রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অভূতপূর্ব তৎপরতা দেখা যেত?

আজও দেশের শত শত ‘রামিসা’ ধর্ষণের শিকার হয়ে বছরের পর বছর ধরে আদালত আর থানার বারান্দায় লেট-লেন্স (Late-lens) বিচারের দোরগোড়ায় নিভৃতে কেঁদে মরছে। রামিসার অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আকতারের যে বর্বরতা-ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ ও মাথা কেটে বালতিতে লুকিয়ে রাখার যে পৈশাচিক পদ্ধতি নথিভুক্ত হয়েছে, তার বিচার দ্রুত হওয়া সময়ের দাবি।

তবে এই গতি যেন কেবল “মিডিয়া ট্রায়াল ও পাবলিক প্রেসার” সামাল দেওয়ার সাময়িক ওষুধ না হয়; একে দেশের প্রতিটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে স্থায়ী আইনি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মহোৎসব: সংখ্যার আড়ালে ব্যবস্থার নগ্নতা

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম মাত্র ৫ মাসেই দেশে কমপক্ষে ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার একটি বড় অংশকেই পরে প্রমাণ লোপাটের জন্য নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের এক অনগ্রসর ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণ, কিংবা যশোরের কেশবপুরে কেবল টিভি দেখতে গিয়ে প্রতিবেশী নরপশুর লালসার শিকার হওয়া-এগুলো কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়, এগুলো রাষ্ট্রের সুরক্ষাব্যবস্থার এক একটা জাজ্বল্যমান ক্ষত।

বর্তমান শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধিতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার জন্য অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির কাগজি বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে? তদন্তের অন্তহীন দীর্ঘতা, আদালতে সাক্ষীদের পুনরায় ট্রমার শিকার হওয়া, প্রভাবশালী আসামিপক্ষের আইনি কারচুপি এবং পুলিশ-মেডিকেল-বিচার বিভাগীয় সমন্বয়ের অভাব আইনগুলোকে কেবল “কাগজের বাঘ” বানিয়ে রেখেছে।

রামিসার মামলাকে কেন্দ্র করে যদি বিশেষ ট্রায়াল কোর্টের মাধ্যমে অবিলম্বে “ভর্তুকিহীন ও ডে-টু-ডে (Day-to-day) শুনানি”র স্থায়ী ব্যবস্থা না করা যায়, তবে এই ১ জুনের ট্রায়াল কেবলই একটি রাজনৈতিক আই-ওয়াশ (Eye-wash) হিসেবে ইতিহাসে নথিভুক্ত হবে।

শুধু ঘাতকের নয়, ‘রাষ্ট্রীয় জড়তার’ বিচার হোক

রামিসার মতো ঘটনায় আমরা শুধু ধর্ষক ও খুনি সোহেল রানার ফাঁসি চাই না, আমরা চাই এই পৈশাচিকতার পথ তৈরি করে দেওয়া ‘রাষ্ট্রীয় জড়তার’ বিচার। ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করা বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ মাত্র। মূল লড়াইটা লড়তে হবে এজলাসে। সেখানে যেন কোনো আইনি ফাঁকফোকর গলে অপরাধী পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করার দায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপক্ষের।

বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া শিশুদের নিরাপত্তা দেওয়া অসম্ভব। রাষ্ট্রকে কেবল সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে হাত ধুয়ে ফেললে চলবে না; প্রতিটি জেলায় বিশেষ শিশু ধর্ষণ ও হত্যা ট্রায়াল কোর্ট স্থাপন, ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য বিনামূল্যে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ, বিচারিক কার্যক্রমের ডিজিটাল রেকর্ডিং, কঠোর ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ (Witness Protection Act) এবং ট্রমাটাইজড শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বাধ্যতামুলক রাষ্ট্রীয় প্যাকেজ হওয়া উচিত।

সম্পাদকীয় শেষ কথা

১ জুন বিচার শুরু হওয়াটা একটা বার্তা, কিন্তু তা যেন কেবলই একটি ফাইল বন্ধের আনুষ্ঠানিকতা না হয়। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আর কোনো রামিসাকে তার জুতো জোড়া ঘরের বাইরে রেখে পাশবিক ধর্ষণ ও লাশের ঘরে যেতে না হয়।

আইনের ডাণ্ডা দিয়ে সাময়িক অপরাধ দমন করা গেলেও, ঘরের পাশে ওৎ পেতে থাকা পিশাচদের মনস্তত্ত্ব বদলানো যাবে না, যদি না আমাদের শিক্ষা, সামাজিক मूल्यবোধ ও পাড়া-মহল্লার প্রতিরোধ ব্যবস্থা জাগ্রত হয়। আজ রামিসা, বান্দরবান বা যশোরের সেই নিষ্পাপ শিশুগুলোর রক্তভেজা হাত আমাদের বিবেক, বিচারালয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

১ জুনের আদালত যেন কেবল খুনি ও ধর্ষক সোহেল রানার ফাঁসির রায় দিয়েই খালাস না নেয়, বরং এ দেশের প্রতিটি শিশুকে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেওয়ার এক ঐতিহাসিক সনদ হয়ে ওঠে। রামিসার নাম যেন কেবল ‘বিচারের ফাইলের ধুলো’য় হারিয়ে না গিয়ে-একটি নিরাপদ, মানবিক ও কলঙ্কমুক্ত বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকে। রাষ্ট্র, এবার আপনার জবাব দেওয়ার পালা!

–মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক