টেলিভিশনের ঝলমলে পর্দা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ভেতরের আলোকিত জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নিকষ অন্ধকারের গল্প উন্মোচিত হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী সহকর্মীদের ওপর মানসিক নিপীড়ন, অর্থ আত্মসাৎ এবং অনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের (DBC News) নির্বাহী প্রযোজক শাফায়েত হোসাইনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ডিবিসি কর্তৃপক্ষ তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়।
বাহ্যিকভাবে পরিপাটি ও পেশাদার পরিচয়ের আড়ালে থাকা শাফায়েতের এই পতন এখন পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।
টক্সিক নিউজরুম: অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হলেই ক্যারিয়ার ধ্বংস!
অভিযোগ রয়েছে, ডিবিসির নিউজরুমে নিজের পদকে পুঁজি করে শাফায়েত হোসাইন একচ্ছত্র এক ভয়ের সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে নতুন ও আকর্ষণীয় নারী উপস্থাপিকাদের টার্গেট করে তিনি ‘মেন্টাল গেম’ খেলতেন।
- প্রলোভন ও চাপ: প্রথমে ভালো শিডিউল, জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, বিশেষ টকশো কিংবা বাড়তি স্ক্রিন-টাইমের প্রলোভন দেখিয়ে সখ্যতা তৈরি করতেন। এরপরই শুরু হতো ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ও অনৈতিক চাপ।
- মানসিক নির্যাতন: তার অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দিলেই শুরু হতো পেশাদার প্রতিশোধ। তুচ্ছ ভুলকে বড় করা, অকারণে নিয়ম চাপানো, অপমানজনক আচরণ এবং ধীরে ধীরে পর্দা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নিতেন তিনি। গত মাসেই তার এই মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে একাধিক নারী উপস্থাপিকা ডিবিসি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
কৌশলে সহকর্মীর চাকরি খাওয়া ও অতীতের বিতর্ক
শাফায়েতের বিরুদ্ধে শুধু নারী সহকর্মী নয়, পুরুষ সহকর্মীদের ক্যারিয়ার ধ্বংসের চাল চালারও অভিযোগ রয়েছে। ডিবিসির সাবেক স্পোর্টস ইনচার্জ তাইয়েব অনন্তকে চাকরিচ্যুত করার নেপথ্যে শাফায়েতের হাত ছিল বলে জানা গেছে। এক নারী উপস্থাপিকাকে ব্যবহার করে তাইয়েবের বিরুদ্ধে একটি সাজানো অভিযোগ তৈরি করেন এবং কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই তাইয়েব অনন্তকে চাকরি হারাতে হয়।
শাফায়েতের অতীতও অর্থ কেলেঙ্কারিতে ঘেরা। এর আগে জনপ্রিয় উপস্থাপিকা মৌসুমী মৌ-এর একটি স্পোর্টস শো-এর দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ডিবিসি থেকে চাকরি হারিয়েছিলেন তিনি। পরে দেশ টিভিতে যোগ দিলেও স্বভাব না বদলানোয় সেখান থেকেও বিদায় নিতে হয়। পরবর্তীতে ডিবিসির অ্যাকাউন্টস বিভাগের এক সাবেক সহকর্মীর সুপারিশে আবারও ডিবিসিতে ফিরে এসে পুরনো রূপ ধারণ করেন তিনি।
বিএনপি নেতার ছবি দেখিয়ে ‘জুজুর ভয়’
অফিসে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে শাফায়েত রাজনৈতিক পরিচয়কেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। মিরপুরের এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে অফিসে এক ধরনের ‘জুজুর ভয়’ তৈরি করে রাখতেন। কথায় কথায় সেই নেতার দাপট দেখিয়ে সহকর্মীদের চুপ করিয়ে রাখা হতো। সহকর্মীদের ভাষায়, “তিনি যেন একজন প্রযোজক নন, বরং এক মূর্তিমান আতঙ্ক।”
ফাঁস হওয়া অডিওতে উন্মোচিত মুখোশ
সম্প্রতি এক নারী উপস্থাপিকার সঙ্গে শাফায়েতের একটি গোপন কথোপকথন (Audio Leak) ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। সেই অডিওতে দেখা যায়, সাবেক উপস্থাপিকা তানিয়া হারুন চ্যানেল ওয়ানে যোগ দেওয়ার পর ‘প্রযত্নে বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানের জন্য নতুন উপস্থাপিকা বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় পরিচালক রুশায়েদ আহসানকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিলেন শাফায়েত। সংবাদ বিভাগের যোগ্য রিপোর্টারদের বাদ দিয়ে আরটিভি থেকে সদ্য যোগ দেওয়া এক উপস্থাপিকাকে সেখানে বসানোর পরিকল্পনাও ফাঁস হয়। একই কথোপকথনে আরো দুই প্রযোজকের নারীঘটিত প্রসঙ্গ ও এক সাবেক সচিবের নামও উঠে আসে।
তদন্ত কমিটির অ্যাকশন ও বর্তমান অবস্থা
গোপন অডিও ফাঁসের পর ডিবিসি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেয়। শাফায়েত হোসেনের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি গঠন করা হয় চার সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে শাফায়েতের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অপরাধের সত্যতা পাওয়ায় ডিবিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তবে চাকরি হারিয়েও থেমে নেই শাফায়েত। সূত্র বলছে, দেশের একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে লবিং করার পাশাপাশি পুনরায় ডিবিসিতে ব্যাকডোর দিয়ে ঢোকার জন্য প্রতিদিনই তাকে মহাখালীর ডিবিসি অফিসের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: দৈনিক এখনই সময়










