অপসাংবাদিকতা ও ঘুষ-সংস্কৃতি

আমার পথচলা: সংবাদকর্মী পরিচয়ের পেছনের গল্প

সম্প্রতি অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল বন্ধ নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তাই আমার অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের লেখা।

আমি ২০০৫ সাল থেকে সাংবাদিকতার ভেতর দিয়ে হাঁটছি। ভোরের কাগজে হাতে-খড়ি, তারপর ধীরে ধীরে জাতীয় দৈনিক/সাপ্তাহিক/পাক্ষিক (সমকাল, যুগান্তর, আনন্দআলো, পাক্ষিক টেলিভিশন), টিভি চ্যানেল (এশিয়ান টিভি, দীপ্ত টিভি, ডিবিসি) আর অনলাইন পোর্টাল—সব জায়গার অভিজ্ঞতা আমার ঝুলিতে জমতে থাকে। তবু আজও নিজেকে “সাংবাদিক” বলে জাহির করতে আমার সংকোচ হয়; আমি নিজেকে সংবাদকর্মী বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এই পেশার ভার, নৈতিকতা আর দায়বদ্ধতার মানদণ্ড এত উঁচু যে, নিজের স্থানকে আগে সৎভাবে বোঝা দরকার, বড় পরিচয় দেওয়ার আগে।

এই বোঝাপড়া থেকে আমি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ডজনখানেকেরও বেশি কোর্স ও প্রশিক্ষণ করেছি—পিআইবি, ডিডব্লিউ, এএফপি, এমআরডিআই, রয়টার্স, ফোজো সহ নানা প্রতিষ্ঠানে। পিআইবি থেকে সাংবাদিকতার ডিপ্লোমাও করেছি, এখনও পড়ছি, শিখছি, নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি । এ কারণেই আমি সাংবাদিকতাকে কখনো শুধু পেশা হিসেবে দেখিনি; এটা আমার কাছে নৈতিক দায়, সামাজিক দায়িত্ব, আর ব্যক্তিগত সাধনার একটা পথ।

২০১১ সালে নিউজ এডিটর হিসেবে প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল জগতে বাংলাবাজার নিউজ দিয়ে প্রবেশ করি। তারপর ভিন্নবার্তা, ব্রেকিং২৪নিউজ, বিডিটাইমস২৪,ট্রুয়েল নিউজ সহ আরো কিছু নিউজ পোর্টালে সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি।

২০২০ সাল থেকে আমি নিজের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালনা করছি। শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি নীতি মেনে, তথ্য যাচাই করে, কারও হয়ে কাজ না করে বরং পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে কাজ করতে। তবে এত কিছুর পরও একটি জায়গায় আমি ইচ্ছে করেও যাইনি—সেটা হলো সরকারি নিবন্ধনের আবেদন। কারণ অনলাইন পোর্টাল নিবন্ধন প্রক্রিয়ার ভেতরের অন্ধকার আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি ।

অপসাংবাদিকতা ও ঘুষ-সংস্কৃতি
পুরনো লেখা, সেকাল

বাংলাদেশে অপসাংবাদিকতার শুরু ও বিবর্তন

বাংলাদেশে অপসাংবাদিকতার সূচনা নির্দিষ্ট কোনো তারিখ দিয়ে বাঁধা যায় না; এটা ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক কাঠামোগত সংকট। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্র রাষ্ট্রগঠন, দলীয় রাজনীতি আর মতাদর্শিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতার কাছে থাকার প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে । পরবর্তীতে বেসরকারি টেলিভিশন যুগে টিআরপি, বিজ্ঞাপন আর প্রতিযোগিতার চাপ সাংবাদিকতার চরিত্রকে আরও বদলে দেয়।

চটকদার শিরোনাম, অর্ধসত্য তথ্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত, এবং করপোরেট স্বার্থরক্ষায় ‘নিউজ ম্যানেজমেন্ট’—এসব ধীরে ধীরে অনেক জায়গায় নিত্যদিনের চর্চায় পরিণত হয় । অনলাইনের আগেও অপসাংবাদিকতা ছিল, কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে এর গতি, পরিসর আর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে আজ অপসাংবাদিকতা শুধু কিছু ব্যক্তি-সাংবাদিকের বিচ্যুতি নয়, বরং এক ধরনের সিস্টেমিক অসুখ, যা পুরো গণমাধ্যম বাস্তুতন্ত্রকে আক্রান্ত করেছে।

নিবন্ধিত গণমাধ্যম ও হলুদ সাংবাদিকতা

প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন চ্যানেল বা বড় অনলাইন পোর্টাল—কেউই শতভাগ নির্দোষ নয়। বড় মিডিয়া হাউসগুলো অনেক সময়ে নৈতিকতা ও যাচাইয়ের মান বজায় রাখে ঠিকই, কিন্তু টিআরপি, ক্লিক, বিজ্ঞাপনদাতা, রাজনৈতিক চাপ এবং মালিকানার স্বার্থ—এসবের টানাপোড়েনে তারা নীতির কাছ থেকে সরে যায় ।

হলুদ সাংবাদিকতা শুধুই ভুঁইফোড় অনলাইন বা অখ্যাত পোর্টালের সমস্যা—এভাবে ভাবলে ভুল হবে। প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াও কখনো কখনো অতিরঞ্জিত শিরোনাম, একপেশে বয়ান, প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন এবং ‘এক্সক্লুসিভ’ নামের বিশেষ ব্যবস্থায় সত্যের একটা অংশ আড়াল করে রাখে । ফলে জনগণের চোখে পুরো গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে, আর সত্যিকারের পেশাদার সাংবাদিকদের পরিশ্রমও অবমূল্যায়িত হয়।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল: সম্ভাবনা বনাম অপসাংবাদিকতা

ডিজিটাল যুগে অনলাইন গণমাধ্যম তথ্যের গণতন্ত্রীকরণে বড় ভূমিকা রেখেছে। আগে যেখানে জাতীয় গণমাধ্যমের বাইরে কোনো কণ্ঠস্বর শোনা যেত না, এখন উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ের ছোট অনলাইন পোর্টালও স্থানীয় দুর্নীতি, সামাজিক সমস্যা ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনছে । অনেক সময় মূলধারার মিডিয়া যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে অনলাইন সংবাদকর্মীরা উপস্থিত থাকে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সংকটের বীজ। ন্যূনতম সম্পাদকীয় কাঠামো, তথ্য যাচাই বা পেশাগত নীতি ছাড়াই অনেকেই অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে বসেছে। কেউ নিজেদের রাজনৈতিক/ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করছে, কেউ ব্ল্যাকমেইলিং, কারও কাজ শুধু ভিউ আর মনিটাইজেশন । এতে করে প্রকৃত অনলাইন সংবাদকর্মীদের পরিশ্রম যেমন অবমূল্যায়িত হচ্ছে, তেমনি পুরো প্ল্যাটফর্মই ‘ভুঁইফোড়’ তকমা পাচ্ছে।

আমার নিজের নিউজ পোর্টাল চালানোর অভিজ্ঞতায় দেখেছি—ইচ্ছে করলে খুব সহজেই চটকদার শিরোনাম, অর্ধসত্য তথ্য আর ব্যক্তিগত আক্রমণ দিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে ভাইরাল হওয়া যায়। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতি সেখানে কোথায় দাঁড়াবে? আর দীর্ঘমেয়াদে নিজের বিবেক, পরিচয় এবং পাঠকের আস্থা কোথায় যাবে? এই প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়েই আমি সচেতনভাবে অপসাংবাদিকতার শর্টকাট পথ থেকে দূরে থেকেছি।

নিবন্ধন, ঘুষ-সংস্কৃতি ও লবিংয়ের অন্ধকার চিত্র

অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিবন্ধন চালু হওয়ার পর সরকারিভাবে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল তা হল—অপসাংবাদিকতা রোধ, ভুঁইফোড় পোর্টাল বন্ধ, ও জবাবদিহি তৈরি করা । নীতিগতভাবে এগুলো ভুল কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া যতটা না স্বচ্ছতা ও মানদণ্ড, তার চেয়ে বেশি হয়েছে ঘুষ, লবিং ও প্রভাবের খেলাঘর—এমন অভিযোগ মিডিয়া মহলে প্রায় সবার মুখেই।

ফর্ম, ফি, টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র—এসব কাগজপত্র সামলানো কঠিন নয়। আসল কঠিন জায়গা হলো অনানুষ্ঠানিক ধাপগুলো, যেখানে “ঠিক জায়গায় কথা বলে নেওয়া”, “সঠিক লোকের রেফারেন্স নেওয়া” বা “ফাইল দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য সহযোগিতা”—ইত্যাদি কথায় ঘুষ ও প্রভাবের ভাষা লুকিয়ে থাকে ।

আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ নিবন্ধন পায় না, আর অন্যদিকে যারা লেখালেখি বা সাংবাদিকতা সম্পর্কে খুব কম জানে, তারা টাকার জোরে, রাজনীতির ছায়ায় বা ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে “সম্পাদক”, “মালিক” বা “চিফ রিপোর্টার” হয়ে যায় । এ বাস্তবতা দেখেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—এই ঘুষ-সংস্কৃতির অংশ হয়ে বৈধতা পাওয়ার চেয়ে নিবন্ধন ছাড়া নীতিমানে থাকা আমার কাছে অনেক বেশি সম্মানের।

অপসাংবাদিকতা ও ঘুষ-সংস্কৃতি
পুরনো লেখা, স্বর্ণালী দিন

ফেসবুক, গুজব ও অপসাংবাদিকতার ত্বরান্বিত হওয়া

ফেসবুক আজ বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষের কাছে প্রধান খবরের উৎস। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মে গুজব, ফেক নিউজ, ভুয়া স্ক্রিনশট আর কনটেক্সটবিহীন পুরোনো ছবি/ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা । কোনো একটি অনলাইন পোর্টাল যাচাইহীন খবর ছড়িয়ে দিলে, কয়েক মিনিটের মধ্যে তা অসংখ্য ব্যক্তিগত আইডি ও পেজে শেয়ার হয়ে যায়—সংশোধন বা আপডেটের জায়গা থাকে খুবই কম।

ফেসবুকে “জার্নালিস্ট”, “স্টাফ রিপোর্টার”, “ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর” ইত্যাদি লেখা আইডি বা পেজ হাজার হাজার। এদের অনেকেই কোনো পত্রিকা বা পোর্টালের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নয়; কিন্তু নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব খাটানো, ছবি তুলে ভয় দেখানো, টাকা আদায় করা—এসব কাজ করে থাকে । ফলে সাধারণ মানুষ যখন “অনলাইন সাংবাদিক” শব্দটি শোনে, তখন প্রকৃত পেশাদারের সঙ্গে এই ভুঁইফোড়দেরও এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ফেলে।

মূলধারার মিডিয়াও কখনো কখনো ফেসবুকের ভাইরাল ট্রেন্ডের পেছনে দৌড়ায়। দ্রুততার চাপে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াকে “প্রাইমারি সোর্স” ধরে নিয়ে খবর করে ফেলে; পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হলে ক্ষতি আগেই হয়ে যায় । এই পুরো প্রক্রিয়াই অপসাংবাদিকতাকে গতি ও শক্তি দেয়।

যোগ্যতা, চাকরি সংকট ও নীতিবানদের টানাটানি জীবন

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো—আজ এত শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাওয়া সহজ নয়। অনেক সময় বলা হয়, “আপনি বেশি যোগ্য, আমাদের লেভেলে ফিট করবেন না”, আবার কখনো বলা হয়, “আপনার বেতন ডিমান্ড আমাদের বাজেটের বাইরে।” কথার আড়ালে মূল সমস্যা থাকে অন্যত্র—স্বজনপ্রীতি, লবিং, রেফারেন্স আর অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ।

যারা নীতি ধরে রাখে, কারও স্বার্থে ‘ম্যানেজড নিউজ’ করতে রাজি হয় না, তারা অনেক সময় আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকে। জীবনে টানাটানি থাকে, সংসার চালানো কঠিন হয়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যায়। আমি নিজেও সেই বাস্তবতার মধ্যেই আছি। সাংবাদিকতায় অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য পাই না; কিন্তু এই পেশা আমার কাছে এখন এক ধরনের নেশা, আবার সামাজিক দায়বদ্ধতাও। তাই অনেক কষ্ট, হতাশা আর ত্যাগ সত্ত্বেও সাংবাদিকতা পুরোপুরি ছাড়ার কথা ভাবতে পারি না ।

অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য কী করা জরুরি

প্রথম কাজ হওয়া উচিত—বিদ্যমান নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালের একটি যোগ্যতা-ভিত্তিক ম্যাপিং করা। কাগজে-কলমে নিবন্ধনের চেয়ে বেশি জরুরি হলো: তাদের সম্পাদকীয় কাঠামো আছে কি না, সংবাদকর্মীরা প্রশিক্ষিত কি না, ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়া আছে কি না, আর তারা গুজব বা অপপ্রচার করে কি না—এসব যাচাই করা ।

যে সব পোর্টাল স্পষ্টভাবে অপসাংবাদিকতা, ব্ল্যাকমেইলিং, হেট স্পিচ বা গুজব ছড়ায়, তাদের নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত বা বাতিল করে পুনর্মূল্যায়নের শর্তে নতুন করে আবেদন করতে বাধ্য করা যেতে পারে । এতে একদিকে ভুঁইফোড় পোর্টালের দৌরাত্ম্য কমবে, অন্যদিকে নীতিমানে চলা ছোট পোর্টালগুলোর জন্যও একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।

নতুন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ-মুক্ত, স্বচ্ছ ও পাবলিক মানদণ্ড থাকা জরুরি। যেমন—সম্পাদকীয় বোর্ডের যোগ্যতা, স্থায়ী অফিস, ন্যূনতম সংখ্যক প্রশিক্ষিত সংবাদকর্মী, ফ্যাক্ট-চেকিং নীতি, আচরণবিধি, আর্থিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি । এসব মানদণ্ড পূরণ না করলে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থ দিয়ে নিবন্ধন পাওয়া যাবে না—এমন নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।

অপসাংবাদিকতা ও ঘুষ-সংস্কৃতি

সিস্টেম চেঞ্জ: শুধু অননুমোদিত পোর্টালকে দোষ দিয়ে লাভ নেই

বাংলাদেশে অপসাংবাদিকতার জন্য শুধু অননুমোদিত অনলাইন পোর্টালকে দায়ী করলে বাস্তবতা বিকৃত হয়। দলীয়করণ, তেলবাজি, কর্পোরেট প্রভাব, মালিকানার স্বার্থ, এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ—এসবও সমানভাবে দায়ী ।

নিবন্ধিত হোক, অনিবন্ধিত হোক—সব গণমাধ্যমকে একই নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। শুধু ভুঁইফোড় অনলাইন বন্ধ করেই অপসাংবাদিকতা বন্ধ হবে না, যদি বড় টিভি চ্যানেল বা জাতীয় দৈনিক একইভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বা কর্পোরেট–নির্ভর থাকে। আবার রাষ্ট্র যদি নিবন্ধনকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানায়, তাহলে সত্যিকারের স্বাধীন ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার জায়গা আরও ছোট হয়ে যাবে ।

দায় তাই সবার—মালিক, সম্পাদক, সংবাদকর্মী, প্রেস কাউন্সিল, আইনপ্রণেতা এবং পাঠক–দর্শকেরও। পাঠক যদি ফেক আর চটকদার শিরোনামে লাইক–কমেন্ট–শেয়ার দিয়ে পুরস্কৃত করে, আর গভীর, ডকুমেন্টেড, নীতিমান রিপোর্টিংকে উপেক্ষা করে, তাহলে অপসাংবাদিকতা থামানো আরও কঠিন হয়ে যাবে।

উপসংহার: সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই শেষ প্রতিরোধ

অপসাংবাদিকতা বন্ধে কেবল আইন, নীতিমালা বা নিবন্ধন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত সততা, পেশাগত নৈতিকতা, আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি । যারা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুষের প্রলোভন, লবিংয়ের চাপ, চাকরি–অস্থিতিশীলতা উপেক্ষা করে নীতি আঁকড়ে ধরে থাকে—তাদের টিকে থাকা মানে আসলে গণমাধ্যমের শেষ ভরসাটুকুর টিকে থাকা।

আমি জানি, নীতিবান সংবাদকর্মীর পথ সহজ নয়। আর্থিক কষ্ট, অনিশ্চয়তা, সামাজিক ভুল–বোঝাবুঝি—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তবু আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিকতা যখন নীতির জায়গা হারায়, তখন সেটা আর সংবাদমাধ্যম থাকে না; সেটা হয়ে যায় ক্ষমতার প্রতিধ্বনি, আর সত্যের কবর।

তাই আজকের এই ডিজিটাল, অনলাইন–নির্ভর, ক্লিকবেইট–সংস্কৃতির ভেতরেও যারা সত্যের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তারাই আসলে ভবিষ্যতের গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড। এবং সেই মেরুদণ্ড ভেঙে না পড়ুক—এই কামনায়, এই দায়বদ্ধতা থেকেই আমি নিজেকে “সাংবাদিক” নয়, সংবাদকর্মী পরিচয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।

  • বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় পরিবর্তনের ধারা – জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল। পিডিএফ রিপোর্ট
  • গণমাধ্যম, বাক্‌স্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ – ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)। সম্পূর্ণ রিপোর্ট
  • সাংবাদিকতায় নৈতিকতা – বাংলাদেশ প্রতিদিন। মূল নিবন্ধ
  • নৈতিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা সময়ের দাবি – Banglanews24। মতামত কলাম
  • গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ – BBC বাংলা। প্রতিবেদনটি পড়ুন
  • গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ – Channel 24। ভিডিওসহ সংবাদ
  • অপসাংবাদিকতা ও তথ্য সন্ত্রাস সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ম্লান করে দিচ্ছে – যুগান্তর। বিস্তারিত দেখুন
  • বন্ধ হোক অপসাংবাদিকতা – দৈনিক সকালের সময়। সম্পাদকীয়
  • গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন – সরকারি প্রতিবেদন। ডাউনলোড লিঙ্ক