Home অপরাধ মোহাম্মদপুর: ঐতিহ্যের আড়ালে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য

মোহাম্মদপুর: ঐতিহ্যের আড়ালে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য

36
0
মোহাম্মদপুর সন্ত্রাস

ঢাকার মোহাম্মদপুর বললেই এখন আর কেবল সাত গম্বুজ মসজিদ বা মোঘল স্থাপত্যের কথা মনে পড়ে না; বরং এটি এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের জনপদ। বুড়িগঙ্গার তীরের এই প্রাচীন জনপদ কীভাবে অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হলো, তার নেপথ্যে রয়েছে ষাট বছরের রাজনৈতিক ও দখলদারিত্বের ইতিহাস।

১. নামকরণের রাজনীতি ও আদি পরিচয়

মোগল আমলে যে এলাকাটি ‘মোহনপুর’ নামে পরিচিত ছিল, আইয়ুব খানের আমলে ধর্মীয় রাজনীতির প্রলেপ দিয়ে তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদপুর। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনামলে ইসলামী নাম ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে পুঁজি করার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, আজও তার রেশ রয়ে গেছে।

২. জমি দখল ও ধর্মের অপব্যবহার

মোহাম্মদপুরে নদী ও খাল ভরাট করে আবাসন ব্যবসার যে রমরমা প্রসার ঘটেছে, তার পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট কৌশল:

  • ধর্মীয় ঢাল: অবৈধ জমি দখলের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে প্রথমে একটি মসজিদ বা ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে তোলা হয়, যাতে উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়।
  • লাঠিয়াল বাহিনী: এই জমিগুলো পাহারা দেওয়া এবং দখলের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। আশি ও নবব্বইয়ের দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ, ইমন বা পিচ্চি হেলালদের উত্থান এই প্রক্রিয়ারই অংশ।

৩. কিশোর গ্যাং: ১০ লাখ মানুষ বনাম ১০৫ সন্ত্রাসী

বর্তমানে মোহাম্মদপুর নিয়ন্ত্রণ করছে তথাকথিত ‘কিশোর গ্যাং’, যাদের বেশিরভাগ সদস্যই আসলে যুবক বা মধ্যবয়সী। পুলিশের তথ্যমতে:

  • সক্রিয় গ্রুপ: ১৭টি (মোট ৫০টির মধ্যে)।
  • সদস্য সংখ্যা: মাত্র ১০৫ জন।
  • প্রভাব: এই সামান্য সংখ্যক অপরাধীর কাছে জিম্মি হয়ে আছে এলাকার ১০ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ।
  • নামের বিচিত্রতা: পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই, অ্যালেক্স গ্রুপ, ল ঠেলা, চেতালেই ভেজাল—নামগুলো যেমন অদ্ভুত, তাদের কর্মকাণ্ড ততটাই নৃশংস।

৪. রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ও আশ্রয়দাতা

ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসীদের দাপট কমেনি। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে:

  • আগে যারা আওয়ামী লীগের নাম ভাঙাতো, তারা এখন বিএনপির মুখোশ পরেছে।
  • ১৭টি বড় গ্রুপের মধ্যে অন্তত ১২টি এখন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে।
  • মাদক ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জেনেভা ক্যাম্পের অস্থিরতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

৫. আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও আধিপত্য

সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওয়ার্ড দখলের নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে খুন হয়েছেন অ্যালেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন। এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ‘ভোটের মেশিন’ বা ‘ভয়ের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই এদের নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

মোহাম্মদপুরের এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বর্তমানে কেবল পুলিশের হাতে নেই, কারণ আইনি দুর্বলতা বা রাজনৈতিক চাপে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে।

সতর্কবার্তা: মোহাম্মদপুরবাসীর জন্য আপাতত কোনো বড় সুখবর নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যতক্ষণ এই সন্ত্রাসীদের লালন করবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে পাড়ায় পাড়ায় সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানোই হতে পারে সাময়িক মুক্তির পথ।