ডিজিটাল যুগে সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে গেছে। মোবাইল জার্নালিজম (MoJo) সাংবাদিকতাকে করেছে গতি-সম্পন্ন ও সহজলভ্য। কিন্তু ভিউ, রিচ ও আয়ের দৌড়ে সাংবাদিকতার মূল নীতি—বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধ—আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
এ সংকট শুধু মোবাইল সাংবাদিকদের কারণে নয়—
মূলধারার গণমাধ্যম, অনলাইন মিডিয়া এবং অসংখ্য অদক্ষ ব্যক্তি–কেন্দ্রিক মিডিয়ার অপব্যবহার মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের “ক্রাইসিস সাংবাদিকতা”।
২০০৫ সালে দেশের এক জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে আমার সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু। অর্থহীন শ্রম, দিন-রাত পরিশ্রম, নীতি–নৈতিকতার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য—এসব ছিল সেই সময়ের সাংবাদিকতার ভিত্তি। তখন একজন সাংবাদিক যে মর্যাদা, সম্মান ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতেন—আজ তার সামান্য অংশও কি অবশিষ্ট আছে?
প্রিন্ট মিডিয়া, টিভি চ্যানেল, অনলাইন পত্রিকা সব মাধ্যমে কাজ করেছি ও করছি। নিজের অভিজ্ঞতা থকে দেখেছি কিভাবে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতা ডুবছে। আজ নিজেকে ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী হিসেবেও পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হয়। কেন এই অবস্থা? দায় কার? প্রথম দায় অবশ্যই আমাদের নিজের। আমরা নীতি ভেঙেছি, পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়েছি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বে জড়িয়েছি, দালালি ও সুবিধাবাদকে সাংবাদিকতার আসনে বসিয়েছি। টাকার প্রলোভনে পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্টিং করেছি।
ফলাফল—একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে হাজার হাজার গণমাধ্যমের জন্ম হলেও প্রকৃত সাংবাদিকতার ছায়াটুকুও বহু ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। গড়ে উঠেছে শুধু ‘মিডিয়া’—কিন্তু বিলুপ্ত হয়েছে সাংবাদিকতার আত্মা।
ডিজিটাল যুগের প্রবল স্রোতে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও অনলাইন পোর্টালে কাজ করা বহু অদক্ষ ‘সংবাদকর্মী’ নামধারী—যাদের অধিকাংশই মোবাইল ও ট্রাইপড হাতে মোজো জার্নালিস্ট হওয়ার দৌড়ে নেমেছে—তাদের অনিয়ন্ত্রিত ভিড় আজ মূলধারার সাংবাদিকদের জন্য প্রকৃত প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে।
যে কোনো ঘটনাস্থলে পেশাদার রিপোর্টারদের আগে উপস্থিত হয় একদল অনভিজ্ঞ ভিড়, যারা সংবাদ সংগ্রহের ন্যায়নীতি বা পেশাগত শৃঙ্খলার ধারেকাছেও নেই। সর্বত্র তাদের এমন বেপরোয়া উপস্থিতি ও আচরণের কারণেই অনেকেই ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে তাদের ‘লাঠি সাংবাদিক’ বলে অভিহিত করেন—আর এই ব্যঙ্গ কেবল তাদের উদ্দেশে নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপরই ছায়া ফেলে।
⭐ সাংবাদিকতার নীতিমালার মূল ভিত্তি (Ethics Reference)
বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সাংবাদিকতার নীতিমালা—
IFJ (International Federation of Journalists) Code of Ethics
এবং
UNESCO Journalism Standards
–এর মূল কথাগুলো হলো—
- সত্য ও সঠিক তথ্য উপস্থাপন
- তথ্য যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা
- নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্মান
- সেনসেশনাল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ এড়িয়ে চলা
- মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার রক্ষা
- ঘুষ, সুবিধা বা প্রলোভন গ্রহণ না করা
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে—
ভিউ–নির্ভর সাংবাদিকতা এই নীতিগুলোর অধিকাংশক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে।
⭐ ভিউ-এর জন্য সাংবাদিকতা কেন অবনতি হচ্ছে?
১) ক্লিকবেইট শিরোনাম
অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর বা সেনসেশনাল শিরোনাম ভিউ বাড়ালেও বিশ্বাসযোগ্যতা কমায়।
২) তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ
দ্রুত আপলোডের চাপে ভুল বা অসম্পূর্ণ সংবাদ ছড়ায়।
৩) গোপনীয়তা লঙ্ঘন
রাস্তায় দুর্ঘটনা, ব্যক্তিগত মুহূর্ত, পারিবারিক বিবাদ—
সবই “ব্রেকিং নিউজ” বানিয়ে ভাইরাল করা হচ্ছে।
৪) ক্রাইম ও রক্তাক্ত ভিডিওর বন্যা
দায়িত্বশীল জার্নালিজমের পরিবর্তে ‘শক ভ্যালু’ তৈরি করা হচ্ছে।
⭐ মোবাইল জার্নালিস্টদের কারণে সংকট আরও কেন বাড়ছে?
মোবাইল সাংবাদিকতা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও—
১) প্রশিক্ষণবিহীন রিপোর্টার
অনেকেই সাংবাদিকতার নীতি, আইন বা ফ্যাক্ট-চেকিং জানেন না।
২) বেপরোয়া লাইভ
“যা দেখছি, তাই লাইভ”—এই প্রবণতা সাংবাদিকতাকে অগোছালো করছে।
৩) নিজের মতামতকে খবর বানানো
Mobile reporting = opinion reporting — এমন ভুল ধারণা ছড়াচ্ছে।
⭐ মূলধারার গণমাধ্যমেরও বড় ভুল আছে
অনেকে মনে করেন সমস্যা শুধু “মোবাইল সাংবাদিকদের”—
কিন্তু বাস্তবে মূলধারার গণমাধ্যমও নানা কারণে সঠিক সাংবাদিকতা থেকে সরে যাচ্ছে।
১) যোগ্যতাবিহীন নিয়োগ
অনেক প্রতিষ্ঠানে—
- সাংবাদিকতার শিক্ষা নেই
- নীতিমালা জানা নেই
- পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই
তবুও অযোগ্য মানুষ তদবির করে সুযোগ পাচ্ছেন, যা মান কমিয়ে দিচ্ছে।
২) সঠিক সংবাদ অপেক্ষা বিজনেসকে বেশি অগ্রাধিকার
অনেক মিডিয়ায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নেই।সরকার, ব্যবসায়ী বা বিজ্ঞাপনদাতার চাপে সংবাদ পরিবর্তন/লুকানো হয়।
৩) সময়মতো বেতন না দেওয়া
দীর্ঘদিন বেতন না পেলে—
- সাংবাদিকরা মানসিক চাপে পড়েন
- কাজের মান কমে
- কেউ কেউ বেঁচে থাকার জন্য ভুল পথে যান
এ সমস্যা মিডিয়ার পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করে।
⭐ “মোবাইল সাংবাদিক = মূলধারা সাংবাদিক?” ভুল ধারণা
বাস্তবে—
✔ সবাই সাংবাদিক নয়
✔ মোবাইলে ভিডিও ধরলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না
✔ অদক্ষ রিপোর্টারদের ভুলে পুরো পেশার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এই ভুল ধারণার কারণে অনেকেই মূলধারার দক্ষ সাংবাদিকদের ব্যঙ্গ করে বলেন—
➡ “লাঠি সাংবাদিক”
এটি শুধু অসম্মানজনক নয়, বরং সাংবাদিকতার পেশাদার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
⭐ অনলাইন মিডিয়ার অপব্যবহার ও ঘুষে অনুমতি পাওয়া পোর্টালের বিস্তার
বর্তমানে দেশে হাজার হাজার অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে।
এর মধ্যে অনেকগুলোই—
- যাচাই-বাছাই ছাড়া নিবন্ধিত
- ঘুষ দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে অনুমতি নেয়
- কোনো সম্পাদকীয় নীতি নেই
- মানহীন, ভুয়া বা ব্ল্যাকমেইলিং–ধর্মী কনটেন্ট প্রকাশ করে
এইসব “ফেইক জার্নালিজম”–এর উদ্দেশ্য থাকে—
✔ দ্রুত আয়
✔ লোকজনকে ভয় দেখানো
✔ প্রভাব খাটানো
✔ সত্যকে বিকৃত করা
ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, আর পুরো সাংবাদিকতার ওপর আস্থা হারায়।
⭐ ভিউ–নির্ভর সাংবাদিকতার সামাজিক ক্ষতি
- গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়
- ভুল তথ্য ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়
- পেশাগত মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে
- দক্ষ সাংবাদিকরাও হতাশ হয়ে পড়েন
- মানুষ সংবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়
⭐ করণীয়: কীভাবে সাংবাদিকতার মান রক্ষা করা যায়?
✅ ১) সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
মিডিয়া আইন, নৈতিকতা, ফ্যাক্ট-চেকিং, স্ক্রিপ্টিং—সবার জানা উচিত।
✅ ২) অনলাইন মিডিয়ার কঠোর যাচাই
নিবন্ধন পেতে হলে—
✔ যোগ্য সম্পাদক
✔ নিউজরুম স্ট্রাকচার
✔ পেশাদার নীতি
✔ নিয়মিত মনিটরিং
—এসব নিশ্চিত করতে হবে।
✅ ৩) ভিউ নয়—মানকে অগ্রাধিকার
সংবাদ হলো সামাজিক দায়িত্ব, বিনোদন নয়।
✅ ৪) সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন ও চাকরি নিরাপত্তা
নিরাপত্তা ও সম্মান না পেলে গুণগত কাজ পাওয়া অসম্ভব।
✅ ৫) সেনসেশনাল শিরোনাম কমানো
তথ্যভিত্তিক, সংক্ষিপ্ত, সৎ শিরোনাম ব্যবহার করা উচিত।
✅ ৬) অসৎ সাংবাদিকদের চিহ্নিত করতে হবে
“লাঠি সাংবাদিক”, “ফেইক রিপোর্টার”—
এদের আলাদা করা গেলে মূলধারার সাংবাদিকতার সম্মানও ফিরে আসবে।
উপসংহার
সাংবাদিকতার সংকটের দায় শুধু মোবাইল সাংবাদিকদের নয়—
মূলধারার মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, অযোগ্য নিয়োগ, কম বেতন, ভিউ-এর প্রতিযোগিতা—
সব কিছুই মিলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভাল সাংবাদিকতা ফিরে পেতে প্রয়োজন—
✔ নৈতিকতা
✔ প্রশিক্ষণ
✔ দায়িত্ববোধ
✔ স্বচ্ছতা
✔ স্বাধীনতা
মানসম্মত সাংবাদিকতাই সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারে—ভিউ নয়, সত্যিই সাংবাদিকতার আসল শক্তি।
— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক







