১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনা পার্কে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাড়ে চার দশকের পথচলায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
১৯৭৫-এর বাকশাল-পরবর্তী শূন্যতা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা, বেগম খালেদা জিয়ার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন-
বিএনপির ইতিহাস মূলত আন্দোলন, সংগ্রাম ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের ইতিহাস।
১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও প্রারম্ভিক অধ্যায় (১৯৭৮-১৯৮১)
১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল শাসনের পর দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন স্বাধীনতার ঘোষক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা পার্কের উন্মুক্ত চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আত্মপ্রকাশ করে।
প্রতিষ্ঠাকালেই দলটি তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তোলে: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি।
রণাঙ্গনের বিপুলসংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সূচনাতেই এটি সাধারণ মানুষের কাছে এক আস্থার রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
আরো পড়ুন- শহীদ জিয়াউর রহমানের পুরো জীবনী
১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে দলটি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে।

২. খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন (১৯৮১-১৯৯০)
সংকটময় সেই মুহূর্তে রাজনীতিতে পা রাখেন জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮০-এর দশকজুড়ে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন তিনি।
দীর্ঘ নয় বছরের রাজপথের আন্দোলনে তিনি বহুবার কারারুদ্ধ হন, কিন্তু কোনো প্রলোভন বা চাপের মুখে আপস করেননি।
অবশেষে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশে নতুন করে গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়।
৩. প্রথম ও দ্বিতীয় সরকারি মেয়াদ (১৯৯১-১৯৯৬)
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এই মেয়াদের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অর্জন ছিল ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে বিল পাসের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আইনি অনুমোদন দেয়।

৪. বিরোধী দলীয় সংগ্রাম ও তৃতীয় সরকারি মেয়াদ (১৯৯৬-২০০৬)
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে। এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে।
এই মেয়াদে গ্রহণ করা নানা অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো, নারী শিক্ষা ও রপ্তানি খাতের প্রসারে দলটি বড় অবদান রাখে।

৫. দমন-পীড়ন ও দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম (২০০৬-২০২৪)
২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বিএনপির জন্য এক দীর্ঘ ও কঠিন অধ্যায়ের সূচনা করে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা হয়।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটি সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে।
একের পর এক মামলা ও সাজায় ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকেন।
আর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
৬. ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, শোক ও ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন (২০২৪-২০২৬)
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি পুনরায় রাজনীতিতে স্বীয় শক্তিতে সক্রিয় হয়।
তবে এই বিজয়ের আবহের মধ্যেই দলটির ওপর নেমে আসে শোকের ছায়া। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে মায়ের শোককে শক্তিতে পরিণত করে রাজপথে নামেন তারেক রহমান।
২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তারেক রহমান দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
তারেক রহমান ঢাকা ও বগুড়া দুটি আসনেই জয়ী হন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিএনপির ঐতিহাসিক নির্বাচনি সাফল্য ও মৌলিক অবদান
- নির্বাচনি সফলতা: প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংসদীয় ও প্রসিডেন্সিয়াল মিলিয়ে ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ২০০১ এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভ করে বিএনপি।
- মৌলিক পরিচয়: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুক্তবাজার অর্থনীতি, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনৈতিক নীতি।
দীর্ঘ ৪৮ বছরের আন্দোলন, ত্যাগ ও রাজপথের ইতিহাস পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দায়িত্বে অবতীর্ণ হয়েছে বিএনপি।
— নিউজ ডেস্ক













