সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো: অস্ত্রই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাস্তবে অপরাধবিজ্ঞানীরা ভিন্ন কথা বলেন। তাদের মতে, অস্ত্র নয়, অর্থই একটি অপরাধচক্রকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখে।
কেন অর্থই আন্ডারওয়ার্ল্ডের আসল শক্তি?
যে গ্যাং নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তারা সহজেই নতুন সদস্য নিয়োগ, আইনি লড়াই, পলাতক সদস্যদের সহায়তা, তথ্য সংগ্রহ এবং নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও এর ব্যতিক্রম নয়। গত তিন দশকে রাজধানী ঢাকার সংঘবদ্ধ অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে অস্ত্রের প্রদর্শন কমলেও অর্থের উৎস আরও বহুমুখী হয়েছে।

চাঁদাবাজি: সবচেয়ে পুরোনো আয়ের পথ
দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অন্যতম প্রধান অর্থের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন মালিক সমিতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনে অভিযোগ এসেছে: কিছু এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা, দোকান নির্মাণ, বাজারে পণ্য ওঠানো বা নতুন প্রকল্প শুরু করতে অবৈধ অর্থ দাবি করা হতো।
অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ঠিকাদার: সবার কাছ থেকেই নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
এই ধরনের অর্থ সাধারণত কোনো রসিদ বা আনুষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যমে নয়; বরং ভয়ভীতি, প্রভাব বা স্থানীয় আধিপত্যের মাধ্যমে আদায় করা হতো বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

টেন্ডার অর্থনীতি: উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে অপরাধের বিস্তার
বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অপরাধবিষয়ক গবেষণা এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু এলাকায় দরপত্র প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ ওঠে।
এর মধ্যে ছিল:
- দরপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া
- প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারকে ভয়ভীতি দেখানো
- নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা
- অবৈধ কমিশন বা চাঁদার অভিযোগ
এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
জমি ও রিয়েল এস্টেট: দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থের বাজার
ঢাকায় জমির দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে জমিকে কেন্দ্র করে বিরোধও বেড়েছে।
আইনজীবী, গবেষক এবং সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, খালি প্লট দখলের চেষ্টা, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ এবং রিয়েল এস্টেট প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় নতুন আবাসিক প্রকল্প গড়ে উঠেছে, সেখানে জমি নিয়ে সংঘাতের ঘটনাও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
গার্মেন্টস ঝুট: ছোট বর্জ্য, বড় অর্থনীতি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে ঝুট বা গার্মেন্টস বর্জ্যও একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই খাতকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠে এসেছে।
যদিও অধিকাংশ ব্যবসায়ী বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তবুও কিছু এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এই খাত থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন খাত: নগদ অর্থের সহজ উৎস
বাস টার্মিনাল, ট্রাকস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, পণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় যানবাহন পরিচালনাকে কেন্দ্র করেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এই খাতে প্রতিদিন নগদ অর্থের প্রবাহ থাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের জন্য এটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

হুন্ডি ও অর্থপাচার: সীমান্ত পেরিয়ে অর্থের যাত্রা
সংঘবদ্ধ অপরাধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো অর্থের গন্তব্য।
অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ যদি সহজেই বৈধ অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে অপরাধচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বহুবার হুন্ডি ও অর্থপাচারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন মামলায় অভিযোগ এসেছে যে, অবৈধ অর্থ বিদেশে পাঠানোর জন্য হুন্ডি নেটওয়ার্ক, ভুয়া ব্যবসা, তৃতীয় পক্ষের ব্যাংক হিসাব কিংবা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে প্রতিটি অভিযোগের বিচারিক ফলাফল একই নয়। তাই নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মামলার ক্ষেত্রে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই আইনি ভিত্তি হিসেবে বিবেচ্য।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে অর্থ লেনদেন
এক সময় নগদ টাকাই ছিল অপরাধচক্রের প্রধান ভরসা।এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে কাজ করা গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, অনলাইন আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ভার্চুয়াল সম্পদ ব্যবহারের প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বেড়েছে।
বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের দাবি করতে হলে শক্ত প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকা জরুরি। তাই এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত বা যাচাইবিহীন দাবি থেকে বিরত থাকা উচিত।
অর্থের উৎস বন্ধ না হলে অপরাধও থামে না
বিশ্বজুড়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে:
শুধু গ্রেপ্তার করে অপরাধচক্র ভেঙে ফেলা যায় না।
যদি তাদের:
- অর্থের উৎস,
- অবৈধ সম্পদ,
- সহযোগী নেটওয়ার্ক,
- অর্থপাচারের পথ,
- এবং আর্থিক অবকাঠামো
অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন নেতৃত্ব খুব দ্রুত পুরোনো কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে।
এই কারণেই আধুনিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো শুধু অস্ত্র উদ্ধারের দিকে নয়, “Follow the Money”: অর্থাৎ অর্থের উৎস ও প্রবাহ শনাক্ত করার কৌশলের ওপরও জোর দেয়।
বিশেষ বিশ্লেষণ: কেন অর্থনীতি বোঝা জরুরি?
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কেবল বন্দুক বা সহিংসতার গল্প হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ, অবৈধ প্রভাব, স্থানীয় আধিপত্য এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নেটওয়ার্ক।
এই অর্থনীতিই অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধকে টিকিয়ে রাখে এবং নতুন প্রজন্মের অপরাধচক্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্র তৈরি করে।
সূত্র
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC)-এর প্রাসঙ্গিক প্রকাশনা এবং প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪ ডটকমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।
আগের পর্বগুলো পড়ুন: পর্ব ১ (জন্ম) ও পর্ব ২ (২৩ জনের তালিকা)। পরের পর্বে থাকছে: কীভাবে বন্দুকের বদলে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ হয়ে উঠল আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন হাতিয়ার।
লিখেছেন: মোহাম্মদ মহসীন | ENEWSUP.COM










