রাজধানীর ফুসফুসখ্যাত উত্তরা ৩য় পর্বের দিয়াবাড়ি এলাকায় সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা। সুপ্রশস্ত ২০০ থেকে ৩০০ ফুট সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে প্রতি মাসে আদায় করা হচ্ছে দেড় কোটি টাকারও বেশি চাঁদা।
রাতের অন্ধকারে সরকারি গাছের ডালপালা ও গুঁড়ি কেটে ফুটপাত দখল করে চালানো হচ্ছে এ দখল সাম্রাজ্য, যার নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মী। স্টার নিউজ টিভির ইউটিউবে প্রচারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে নেয়া।
অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। দিয়াবাড়ি দীর্ঘদিন ধরে উত্তরার অন্যতম খোলামেলা ও সবুজ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লেক, খাল ও গাছপালা নগরবাসীর বিনোদন ও স্বস্তির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দিয়াবাড়িতে নগর বন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে; ডিএনসিসির উদ্যোগে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা বনকে রাজউকের ‘গ্রিন বেল্ট’ এলাকার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবুজ এলাকা থেকে দোকানপট্টি
সরেজমিনে স্টার নিউজ টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদক স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানেন, উত্তরা খালপার থেকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ধীরে ধীরে দোকান, গ্যারেজ, খাবারের হোটেল, নার্সারি ও ফার্নিচারের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার অনেকগুলো সড়কের জায়গা, ফুটপাত কিংবা খালের পাড় ঘেঁষে নির্মিত বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সড়কের দুই পাশে বড় গাছ, খোলা জায়গা ও চলাচলের পর্যাপ্ত স্থান ছিল। বর্তমানে দোকানের সামনে পণ্যসামগ্রী রাখা, গাড়ি মেরামত এবং পার্কিংয়ের কারণে সড়কের কার্যকর প্রস্থ অনেক জায়গায় কমে গেছে। এতে মেট্রোরেল স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, স্কুল ও আবাসিক এলাকার সামনে যানজট বাড়ছে।
দিয়াবাড়ির লেক ও খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা থাকার বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্যোগে খাল পরিষ্কারের খবর প্রকাশিত হলেও, পরিষ্কারের পরও দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা থাকার অভিযোগ রয়েছে।
২৮৫ দোকান, মাসে কোটি টাকার লেনদেন?
অনুসন্ধানে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সড়কের দুই পাশে প্রায় ২৮৫টি স্থায়ী ও আধা-স্থায়ী দোকান রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দোকানগুলোর ধরন ও কথিত মাসিক ভাড়ার হিসাব এমন-
| দোকানের ধরন | আনুমানিক সংখ্যা | মাসিক ভাড়ার দাবি |
|---|---|---|
| ফার্নিচারের দোকান | ১২৫টি | ৪০–৫০ হাজার টাকা |
| গাড়ির পার্টস ও চাকার দোকান | ৭০টি | ৩৫–৪৫ হাজার টাকা |
| খাবারের হোটেল, গ্যারেজ ও অন্যান্য | ৯০টি | ৩০–৪০ হাজার টাকা |
এই হিসাব অনুযায়ী মাসিক ভাড়ার সম্ভাব্য অঙ্ক দাঁড়ায় আনুমানিক ১ কোটি ১৫ হাজার টাকা থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ২৮৫টি দোকানের উল্লিখিত সংখ্যা ও ভাড়ার হার সত্য হলে মাসিক আয় ১ থেকে ১.৩ কোটি টাকার মধ্যে হওয়ার কথা।
তবে প্রতিবেদনে দাবিকৃত দেড় কোটি টাকার হিসাবের সঙ্গে দোকানসংখ্যা ও ভাড়ার হিসাব পুরোপুরি মেলে না। অতিরিক্ত দোকান, অগ্রিম জামানত, বিদ্যুৎ বিল, পার্কিং ফি, গ্যারেজ চার্জ কিংবা অন্য কোনো আদায়ের হিসাব যুক্ত থাকলে মোট অঙ্ক বাড়তে পারে। এ বিষয়ে ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, ভাড়া চুক্তি, দোকানভিত্তিক তালিকা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিটি দোকানের জন্য ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘পজিশন ফি’ বা অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। এই দাবি সত্য হলে এককালীন লেনদেনের অঙ্কও কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এর পক্ষে লিখিত রসিদ বা নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
সিন্ডিকেটের মূল চরিত্র ও তাদের ভূমিকা
| নেতা/ব্যক্তির নাম | রাজনৈতিক পদবি/পরিচয় | দখলের এলাকা ও ভূমিকা |
| হারুন রহমান | সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, তুরাগ থানা ছাত্রদল | সিন্ডিকেটের প্রধান নিয়ন্ত্রক। ভাড়ার বড় অংশ তার পকেটে যায়। |
| রাজিব ইসলাম | সভাপতি, চণ্ডালভোগ ইউনিট বিএনপি | বটতলা থেকে ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড পার্ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণে। |
| রিপন | রাজিবের ভাই | চণ্ডালভোগ রাস্তার মাথা থেকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর নিয়ন্ত্রণে। |
| জুয়েল ও মাসুদ | নেতা, তুরাগ থানা যুবদল (জুয়েল) | ভাই মাসুদকে সাথে নিয়ে অন্তত ২৫টি ফার্নিচারের দোকান পরিচালনা করেন। |
| মিন্নাত আলী ও ইমরান | স্থানীয় বিএনপি নেতা (মিন্নাত) | নার্সারি ও গ্যারেজসহ অন্তত ২০টি দোকানের নিয়ন্ত্রণে জড়িত। |
ফুড কোর্টের অনুমতি, নাকি স্থায়ী মার্কেট?
দখল-বাণিজ্যের অভিযোগের সঙ্গে ডিএনসিসির অস্থায়ী বরাদ্দের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০০ বর্গফুট আয়তনের ১৩৪টি অস্থায়ী ফুড কোর্টের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুমতির সুযোগ নিয়ে কিছু বরাদ্দপ্রাপক ফার্নিচারের দোকান, গাড়ির গ্যারেজ ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলেন।
এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি—
- বরাদ্দপত্রে জায়গার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও ব্যবহার কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
- ফুড কোর্টের অনুমতি কি সত্যিই দেওয়া হয়েছিল?
- অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব স্থাপনার মধ্যে পার্থক্য কতটা?
- গাছ কাটার অনুমতি কে দিয়েছে?
- স্থাপনা নির্মাণের সময় ডিএনসিসি, রাজউক বা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো পরিদর্শন হয়েছিল কি না?
- বরাদ্দ বাতিলের পরও দোকানগুলো কেন উচ্ছেদ করা হয়নি?
অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম ধরা পড়ার পর ডিএনসিসি বরাদ্দ বাতিল করে। এরপর সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে তিন মাসের স্থগিতাদেশ পাওয়া যায়। স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও উচ্ছেদ অভিযান না হলে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে আদালতের আদেশের সত্যায়িত কপি এবং ডিএনসিসির বাতিল আদেশ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দ ও মাসিক টাকা আদায়ের সময় একটি রাজনৈতিক দলের নাম ও নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করা হয়। কারও কারও দোকানে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি টাঙানো কিংবা মোবাইল ফোনে নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীরের বক্তব্য হিসেবে জানা গেছে, দলীয় পদে থাকার কারণে অনেকে ছবি তুলতে পারেন বা নিজেদের ঘনিষ্ঠ দাবি করতে পারেন। তবে জনগণের ক্ষতি, পরিবেশ ধ্বংস কিংবা কোনো অপরাধে দল দায় নেবে না; তিনি ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্তদের চেনেন না বা প্রশ্রয় দেন না -এমন বক্তব্য তিনি দিয়েছেন।
এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-যদি কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অবৈধ দখল বা চাঁদা আদায় করে থাকে, তাহলে দলীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না।
আরো জানুন- PalmPay-এর কিস্তি সেবায় ডিজিটাল হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ!
পরিবেশ ও জননিরাপত্তায় ঝুঁকি
দিয়াবাড়ির কথিত দখল শুধু ফুটপাত বা সড়ক সংকুচিত করছে না; এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জননিরাপত্তায়ও।
- গাছ কেটে স্থাপনা নির্মাণের ফলে ছায়া, বায়ুপ্রবাহ ও স্থানীয় তাপমাত্রার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- দোকানের সামনে পণ্য ও যানবাহন রাখায় পথচারীদের সড়কে হাঁটতে হচ্ছে।
- ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে রাস্তা সংকুচিত হলে জরুরি সময়ে গাড়ি বের হতে দেরি হতে পারে।
- মেট্রোরেল স্টেশনকেন্দ্রিক অতিরিক্ত ভিড় ও অব্যবস্থাপনায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
- খাল ও লেকের পাড়ে স্থাপনা হলে পানি প্রবাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হতে পারে।
- রান্নার হোটেল ও গ্যারেজে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রশাসনের কাছে যে প্রশ্নগুলো
দিয়াবাড়ির পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে রাজউক, ডিএনসিসি, ঢাকা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় থানা – সব পক্ষের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রশাসনের কাছে জানতে হবে –
- সড়ক ও ফুটপাতের জমির মালিকানা কোন সংস্থার?
- কতটি দোকানের বৈধ অনুমোদন রয়েছে?
- কোন কোন গাছ কাটা হয়েছে এবং গাছ কাটার অনুমতি ছিল কি না?
- ভাড়া বা পজিশন ফি আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত?
- বরাদ্দ বাতিলের পরও স্থাপনা উচ্ছেদ হয়নি কেন?
- আদালতের স্থগিতাদেশের বর্তমান অবস্থা কী?
- অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র কতটি দোকানের আছে?
আইনি জালিয়াতি ও নথিপত্রের চালবাজি
১. মূল জমিও বরাদ্দ: উত্তরা ৩য় পর্বের এই সড়কটি মূলত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। তবে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনকে (ডিএনসিসি) দেওয়া হয়েছিল।
২. ফুড কোর্টের আড়ালে বাণিজ্য: ডিএনসিসি গত ৩০ অক্টোবর ১০০ বর্গফুটের ১৩৪টি অস্থায়ী ফুড কোর্টের অনুমতি দেয়। কিন্তু বরাদ্দপ্রাপ্তরা রাতারাতি গাছ কেটে ফার্নিচার মার্কেট ও গ্যারেজ গড়ে তোলে।
৩. বাতিল ও হাইকোর্টের রিট: অনিয়ম ধরা পড়ায় ডিএনসিসি ওই বরাদ্দ বাতিল করে। বাতিল ঠেকাতে সিন্ডিকেট সদস্য হাইকোর্টে রিট করলে চলতি বছরের ১২ মার্চ ৩ মাসের স্থগিতাদেশ (Stay Order) দেওয়া হয়।
৪. মেয়াদ উত্তীর্ণ উচ্ছেদহীনতা: স্থগিতাদেশের মেয়াদের ৩ মাস শেষ হয়ে গেলেও রাজউক বা সিটি কর্পোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি।
জনভোগান্তি ও পরিবেশগত প্রভাব
তাপমাত্রা বৃদ্ধি: বনাঞ্চলের প্রাপ্তবয়স্ক গাছ কেটে ফেলায় ওই এলাকায় প্রাকৃতিক ছায়া ও শীতল পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে।
যানজট ও যাতায়াত বাধা: মেট্রোরেল স্টেশন এবং ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনের সড়ক সংকুচিত হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও যানবাহন যানজটে আটকে থাকছে।
সূত্র: স্টার নিউজ
এই অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র প্রকাশের জন্য স্টার নিউজ (Star News) এবং তাদের বিশেষ অনুসন্ধানী দল ‘স্টার ইনভেস্টিগেশন’-কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতিত্ব জ্ঞাপন করা হচ্ছে। সততা ও সাহসিকতার সাথে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই চিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য তাদের পুরো টিমের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা।













