শম্পা জামান সান-কিসড মেকআপ
banner

ফ্যাশন আর সৌন্দর্যের জগতে কিছু নাম আছে, যাঁদের উপস্থিতিই একটা আভিজাত্যের ছাপ রেখে যায়। ফ্যাশন আইকন শম্পা জামান তেমনই একজন। তাঁর রুচি, সাজের পরিমিতিবোধ আর নিজেকে উপস্থাপনের সহজ ভঙ্গি অনেকের কাছেই অনুসরণযোগ্য।

সম্প্রতি তাঁর একটি সান-কিসড পোর্ট্রেট ছবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জানালার ফাঁক গলে আসা দুপুরের রোদ, চুলে আলো-ছায়ার খেলা, ত্বকে শিশিরভেজা দীপ্তি আর ঠোঁটে উজ্জ্বল গোলাপি রঙ, সব মিলিয়ে ছবিটি যেন গ্রীষ্ম আর বসন্তের মাঝামাঝি একটা উষ্ণ মুহূর্তকে ধরে রেখেছে।

এই লেখায় সেই লুকের পেছনের সাজের কৌশলগুলো একটু একটু করে খুলে দেখা যাক।

সান-কিসড লুক আসলে কী

সান-কিসড লুক মানে এমন একটি সাজ, যেখানে মনে হয় সূর্যের আলো নিজেই ত্বকে হালকা ছোঁয়া দিয়ে গেছে। এখানে ভারী ফাউন্ডেশন বা কড়া কনট্যুরিংয়ের জায়গা নেই।

ত্বক হবে জীবন্ত, গাল হবে হালকা উষ্ণ আর পুরো চেহারায় থাকবে এক ধরনের সহজ সতেজতা।

শম্পা জামানের ছবিতে ঠিক এই ব্যাপারটাই চোখে পড়ে। সাজ আছে, অথচ সাজটা চোখে লাগে না। এটাই এই লুকের আসল সৌন্দর্য।

রোদেলা দুপুরে গ্লাস স্কিন ধরে রাখার ধাপে ধাপে গাইড

গ্লাস স্কিন বা শিশিরভেজা ত্বক মানে এমন ত্বক, যা আলো পড়লে নরমভাবে প্রতিফলিত করে। এর জন্য দামি প্রসাধনীর চেয়ে বেশি দরকার ত্বকের যত্ন আর সঠিক ধাপ।

নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে ঘরে বসেই এমন গ্লো পাওয়া সম্ভব।

প্রথম ধাপ: ত্বক পরিষ্কার ও আর্দ্র করা। মেকআপের আগে মুখ হালকা ফেসওয়াশে ধুয়ে নিন। এরপর টোনার বা রোজ ওয়াটার ব্যবহার করুন।

ত্বক ভেজা থাকা অবস্থাতেই হায়ালুরোনিক অ্যাসিডযুক্ত একটি হালকা সিরাম লাগিয়ে নিন। এতে ত্বক ভেতর থেকে ভরাট ও কোমল দেখায়।

দ্বিতীয় ধাপ: ময়েশ্চারাইজার আর সানস্ক্রিন। দুপুরের রোদে বের হলে সানস্ক্রিন বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কমপক্ষে এসপিএফ ৩০ যুক্ত সানস্ক্রিন বেছে নিন। তৈলাক্ত ত্বকে জেল ধরনের আর শুষ্ক ত্বকে ক্রিমি ধরনের সানস্ক্রিন ভালো কাজ করে।

তৃতীয় ধাপ: হালকা বেস। ফাউন্ডেশনের বদলে স্কিন টিন্ট বা বিবি ক্রিম ব্যবহার করুন। আঙুলের ডগা বা ভেজা স্পঞ্জ দিয়ে হালকা হাতে মিশিয়ে নিন।

শুধু দাগ বা ক্লান্তির জায়গায় অল্প কনসিলার দিন। ত্বকের স্বাভাবিক গঠন যেন ঢাকা না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখাই এখানে মূল কথা।

চতুর্থ ধাপ: ক্রিম ব্লাশ ও হাইলাইটার। গালের উঁচু অংশে পিচ বা গোলাপি আভার ক্রিম ব্লাশ আলতো করে মিশিয়ে দিন। এরপর গালের হাড়ে, নাকের ডগায় আর ভ্রুর নিচে তরল বা ক্রিমি হাইলাইটার ছুঁয়ে দিন।

ছবিতে শম্পা জামানের গালে যে নরম ঝিলিক দেখা যায়, তার রহস্য এই ক্রিমি টেক্সচারেই।

পঞ্চম ধাপ: সেটিং। পাউডার এড়িয়ে চলাই ভালো। প্রয়োজন হলে শুধু টি-জোনে অল্প ট্রান্সলুসেন্ট পাউডার দিন।

সবশেষে ফেসিয়াল মিস্ট স্প্রে করলে মেকআপ ত্বকের সঙ্গে মিশে যায় আর সতেজ ভাবটা অনেকক্ষণ থাকে।

প্রাকৃতিক আলোর জাদু: জানালার আলো ও গোল্ডেন আওয়ার

একই মেকআপ আলোর ভিন্নতায় একেবারে ভিন্ন রূপ নেয়। শম্পা জামানের ছবিতে জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলো মুখে, চুলে আর কাঁধে যে নকশা এঁকেছে, তা কোনো স্টুডিও লাইটের পক্ষে তৈরি করা কঠিন।

জানালা থেকে আসা নরম আলো মুখের ওপর পড়লে ত্বকের গঠন মসৃণ দেখায়, চোখে প্রাণ আসে আর ছায়ার ভাঁজগুলো ছবিতে গভীরতা তৈরি করে।

ছবি তোলার সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো গোল্ডেন আওয়ার, অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পরের কিছুক্ষণ আর সূর্যাস্তের আগের কিছুক্ষণ। এই সময়ে আলো সোনালি ও কোমল থাকে।

দুপুরের কড়া রোদে ছবি তুলতে চাইলে সরাসরি রোদে না দাঁড়িয়ে জানালা বা পর্দার পাশে দাঁড়ান। মুখটা আলোর দিকে সামান্য ঘুরিয়ে রাখলে গালে আর নাকের ওপর সুন্দর আভা পড়ে।

আলোর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলে চোখে যে উষ্ণতা ফোটে, তা ছবিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।

আরো পড়ুন- ব্লু-অন-ব্লু ফ্যাশন ট্রেন্ড: আকাশ ও নদীর সাথে সাজের মেলবন্ধন

ডার্ক চকোলেট চুলে কপার হাইলাইটসের সৌন্দর্য

এই লুকের আরেকটি আকর্ষণ চুল। গাঢ় চকোলেট বাদামি চুলের ওপর কপার বা তামাটে রঙের হাইলাইটস রোদের আলোয় যেন জ্বলে ওঠে।

সোজা, মসৃণ চুলে আলো পড়লে যে স্বাভাবিক চকচকে ভাব আসে, তার সঙ্গে জানালার ছায়ার রেখা মিলে এক অসাধারণ কনট্রাস্ট তৈরি করে। কোথাও চুল গভীর কালচে, কোথাও আলো পড়ে তামাটে সোনালি।

এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে চুলের যত্নও জরুরি। রঙ করা চুলের জন্য কালার-সেফ শ্যাম্পু আর নিয়মিত হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করুন।

সপ্তাহে একবার গরম নারকেল বা আর্গান তেলে ম্যাসাজ করলে চুল নরম থাকে।

ব্লো-ড্রাই বা স্ট্রেইটনারের আগে হিট প্রোটেকশন স্প্রে ব্যবহার করতে ভুলবেন না, কারণ রোদ আর তাপে রঙ দ্রুত ফিকে হয়ে যেতে পারে।

হালকা চোখের সাজ আর উজ্জ্বল গোলাপি ঠোঁট

সান-কিসড লুকে চোখের সাজ হবে একেবারে সংযত। বাদামি বা পিচ রঙের আইশ্যাডো পাতায় হালকা করে মিশিয়ে নিন।

চোখের পাতার ওপর ব্রাউন আইলাইনার ছোট টানে দিলে চোখ সুন্দর ফুটে ওঠে।

এরপর মাসকারার এক কোট দিলেই যথেষ্ট। ভ্রু রাখুন প্রাকৃতিক আকারে, শুধু ফাঁক থাকলে ব্রো পেনসিল দিয়ে হালকা ভরাট করুন।

চোখের সাজ যখন এত মৃদু, তখন ঠোঁটের রঙ হয়ে ওঠে পুরো মুখের কেন্দ্রবিন্দু। উজ্জ্বল গোলাপি লিপস্টিক এখানে দারুণ মানিয়ে যায়।

ক্রিমি বা স্যাটিন ফিনিশের লিপস্টিক বেছে নিন, যা ঠোঁটে আলো ধরে রাখে। ম্যাট লিপস্টিক রোদের মধ্যে অনেক সময় শুষ্ক দেখায়, তাই এই লুকে এড়িয়ে চলাই ভালো।

লিপস্টিক লাগানোর আগে ঠোঁটে লিপ বাম দিয়ে নিলে রঙ আরও মসৃণভাবে বসে।

হাই-নেক পোশাক আর রঙিন স্কার্ফের লেয়ারিং

পোশাকের দিক থেকেও ছবিটি অনেক কিছু শেখায়। হাই-নেক বা উঁচু গলার পোশাক একটা মার্জিত ও আভিজাত্যপূর্ণ আবহ দেয়। এর ওপর গাঢ় গোলাপি রঙের নকশাদার স্কার্ফ বা ওড়না কাঁধে ফেলে দিলে পুরো সাজে প্রাণ চলে আসে।

ছাপার কাজ করা হালকা রঙের হাই-নেকের সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের ওড়নার এই মিশেল দারুণ সুন্দর কনট্রাস্ট তৈরি করে।

লেয়ারিংয়ের সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে ভালো। পোশাকের একটি অংশ নকশাদার হলে অন্যটি সাদামাটা রাখুন।

ওড়নার রঙ ঠোঁটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে পুরো সাজে একটা সুসংগত ভাব আসে।

গরমের দিনে সুতি, মসলিন বা ক্রিঙ্কেল কাপড়ের ওড়না বেছে নিন, যা দেখতে সুন্দর এবং পরতেও আরামদায়ক।

সামার ও স্প্রিং বিউটি টিপস

শেষে পাঠকদের জন্য কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ রইল।

  • প্রতিদিন সকালে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন লাগান, মেঘলা দিনেও।
  • সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ভেতর থেকে সতেজ থাকলে ত্বকের গ্লো আপনাআপনি বাড়ে।
  • সপ্তাহে একবার মৃদু এক্সফোলিয়েশন করুন, যাতে মৃত কোষ জমে ত্বক নিস্তেজ না হয়।
  • রাতে ঘুমানোর আগে মেকআপ তুলে মুখ পরিষ্কার করে নিন এবং হালকা নাইট ক্রিম লাগান।
  • ঠান্ডা গ্রিন টি ব্যাগ বা শসার টুকরো চোখে রেখে সপ্তাহে দু-একবার বিশ্রাম দিন, ফোলা ভাব কমবে।
  • ত্বকে বাড়তি আর্দ্রতা পেতে ফ্রিজে রাখা ফেসিয়াল মিস্ট ব্যাগে রাখুন এবং প্রয়োজনমতো ব্যবহার করুন।
  • ঠোঁটের জন্য এসপিএফযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন, যাতে রোদে ঠোঁট শুকিয়ে না যায়।
  • মৌসুমি ফল, বিশেষ করে তরমুজ, পেঁপে আর কমলা খান। এগুলো ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।

সান-কিসড লুকের মূল মন্ত্র হলো সহজতা। দামি প্রসাধনী বা জটিল কৌশলের চেয়ে ত্বকের যত্ন, সঠিক আলো আর নিজের প্রতি আস্থাই এই সৌন্দর্যের আসল ভিত্তি।

রোদেলা দুপুরে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে একটু হাসুন, বাকি কাজটা আলোই করে নেবে।