কলকাতা শিখা ইন হোটেল আগুনে বাংলাদেশিদের মৃত্যু
ছবি: জি২৪ঘন্টা

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে গত গভীর রাতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড থেকে অল্পের জন্য প্রাণ বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি নাগরিকদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে সেই রাতের হাড়হিম করা সব অনুভূতি।

মারাত্মক বিষাক্ত ধোঁয়া, ফায়ার অ্যালার্মের অনুপস্থিতি এবং হোটেলের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ থাকায় নিমিষেই হোটেলটি এক মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়।

এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে ১ শিশু, ২ নারী ও ৬ পুরুষসহ মোট ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া হোটেলের ১৯ বছর বয়সী ঝাড়খণ্ডের এক তরুণ কর্মীও মারা গেছেন।

‘প্রাণ বাঁচাতে ব্যাগপত্র ফেলে দৌড়ে নিচে নামি’: বেঁচে ফেরাদের আকুতি

অল্পের জন্য বেঁচে ফেরা একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক তাঁদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন।

ঢাকার মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে ছেলের অপারেশনের জন্য যাওয়া এক বাসিন্দা বলেন,

“রাতে হোটেলের বয় বিকট শব্দে দরজায় জোর জোরে ধাক্কা দিতে থাকে। দরজা খুলতেই চিৎকার করে বলে—আগুন লেগেছে, এখনই নিচে নেমে আসুন! সম্প্রতি অপারেশন হওয়া বাচ্চার কথা চিন্তা করে প্রাণ হাতে নিয়ে কোনোক্রমে দৌড়ে নিচে নেমে আসি। ঘরের ভেতর জিনিসপত্র সব ফেলে আসতে হয়েছে।”

গাজীপুরের এক বাসিন্দা জানান, রাত দুইটার দিকে হঠাৎ মানুষের আর্তচিৎকারে তাঁর ঘুম ভাঙে। বাইরে বের হয়ে দেখেন ওপরের তলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।

আরো পড়ুন- কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ আগুনে শিশুসহ ৯ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুরো হোটেল মুহূর্তেই কুচকুচে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পরবর্তীতে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে তাঁদের উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনেন।

যে কারণে ঘটল এত বড় বিপর্যয় ও প্রাণহানি

তদন্ত ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সরাসরি আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার চেয়ে বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাস আটকে দম বন্ধ হয়েই অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মূলত হোটেলের কিছু মারাত্মক অব্যবস্থাপনাই এই প্রাণহানিকে ত্বরান্বিত করেছে:

  1. তালাবন্ধ প্রধান ফটক: আগুন লাগার পর আতঙ্কিত অতিথিরা নিচে নেমে আসার চেষ্টা করলেও হোটেলের মেইন গেট তালা দেওয়া ছিল।
  2. জরুরি বহির্গমন পথের অভাব: ভবনটিতে একাধিক গেস্ট হাউস থাকলেও বের হওয়ার পথগুলো ছিল অত্যন্ত সরু ও পেঁচানো।
  3. ফায়ার অ্যালার্মের অনুপস্থিতি: এত বড় বাণিজ্যিক হোটেলে কোনো জরুরি সতর্কীকরণ অ্যালার্ম বাজেনি।
  4. দিকভ্রান্ত হয়ে ছাদে আশ্রয়: নিচে নামার পথ ধোঁয়ায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে প্রাণ বাঁচাতে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে পড়েন।

আইনি পদক্ষেপ ও ফরেনসিক তদন্ত

ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ‘শিখা ইন’ হোটেলের দুই ম্যানেজারকে আটক করেছে। আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎস এবং কোনো ধরণের অবহেলা ছিল কি না তা উদঘাটন করতে একটি বিশেষ ফরেনসিক টিম তদন্ত শুরু করেছে।

এদিকে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের শনাক্তকরণ ও দেশে পাঠানোর বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কাজ করছে।

সূত্র:জি২৪ঘন্টা