তৌফিক ইমরোজ খালিদী
banner

বাংলাদেশের সংবাদসেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেয়ার পুরোধা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কারণে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেয়া হয়। স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবার জানিয়েছে, ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকাকালে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার মরদেহ কবে দেশে আনা হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। জানাজা ও দাফনের স্থান-সময় চূড়ান্ত হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তা জানিয়ে দেয়া হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একজন মুখপাত্র জানান, আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিজেই। তার ভাষায়, এই ক্ষতি পূরণ হবার নয়।

রাষ্ট্রপতির শোকবার্তা

সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন একজন পথিকৃৎ এবং তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ, সজ্জন ও বরেণ্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে হারালো। রাষ্ট্রপতি তার সাথে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতা যুগ

বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদসেবার ইতিহাসে অনেক প্রথমের সাথে জড়িয়ে আছে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম।

২০০৫ সালের প্রথমার্ধে শুরু হওয়া ‘বিডিনিউজ’ তখন অন্য বার্তা সংস্থার মতোই সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য খবর সরবরাহ করতো, তবে টেলিপ্রিন্টারের বদলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করা প্রথম সংস্থা ছিল এটিই।

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পর তার খোল-নলচে বদলে যায়। সে বছর জুলাই মাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানির রূপ দেয়।

২৩ অক্টোবর নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৪ ঘণ্টার সংবাদসেবা, যা দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশে ডিজিটাল সংবাদ যুগের যাত্রা। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ও বিকাশ

১৯৬৭ সালের ১৪ জুন তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৮৯ সালে সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকার মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতার সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে সহকারী সম্পাদক ও সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কূটনীতি, বাণিজ্য, রাজনীতি ও দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করেন।

ডেইলি স্টারে তিনি কূটনৈতিক প্রতিবেদক (১৯৯১-১৯৯৩), বিজনেস এডিটর (১৯৯৭-১৯৯৮) এবং যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও উইকেন্ড এডিশনের বার্তা সম্পাদক (১৯৯৮-২০০০) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের জুন পর্যন্ত লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেন তিনি, যেখানে সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা-উপস্থাপনার পাশাপাশি বহুল আলোচিত ‘ডিবেট’ অনুষ্ঠানও সঞ্চালনা করতেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা

প্যারিসের জার্নালিস্টস ইন ইউরোপ ফাউন্ডেশন এবং জাপান ফরেন প্রেস সেন্টারের ফেলো হিসেবে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে এশিয়া-প্যাসিফিক, ল্যাটিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ার ‘১৪ জন শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবক’-এর একজন হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবসে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়, আর ২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির (২০১২ ও ২০১৫) সদস্য ছিলেন তিনি,

পাশাপাশি ২০০৮ সালে বার্তা সংস্থাগুলোর নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি এবং ২০০৭ সালে ঢাকার নদী রক্ষার জাতীয় টাস্কফোর্সেরও সদস্য হিসেবে কাজ করেন তিনি।