জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে রিকশায় বসে থাকা এক স্কুলশিক্ষিকা। ছিনতাইকারীর টান খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে তার মৃত্যু হয় নিমেষেই।
এই একটি দৃশ্যই বলে দেয়, রাজধানীর রাজপথ এখন কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
রনজিনা পারভীন নামের সেই শিক্ষিকার মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি মাত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই, এই তিন মাসেই সারা দেশে ৯৩৪টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে তিনশোর বেশি, দিনে গড়ে দশের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন হত্যাকাণ্ডে। আর সাড়ে সাত মাসে দেশজুড়ে গুলির ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২৩টি, যাতে প্রাণ গেছে পঞ্চাশের বেশি মানুষের।
প্রশ্নটা তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, এই অস্ত্র আসছে কোথা থেকে, আর এর দায় আসলে কার?

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা: যখন দিনদুপুরেও থামছে না গুলি
গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, অস্ত্রের এই প্রকাশ্য ব্যবহার কতটা বেপরোয়া রূপ নিয়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার সরদার গলিতে এক রাতে হেলমেট পরা সাত-আটজন সন্ত্রাসী চারটি মোটরসাইকেলে এসে সাগর খান ইমরান ও বিদ্যুৎ জাকারিয়া নামের দুজনকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।
মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইমরান, আর জাকারিয়া এখনো চিকিৎসাধীন।
এর একদিন পরই পাবনার আটঘরিয়ায় হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল থামিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা আদম আলীকে প্রথমে গুলি, পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
আবার যাত্রাবাড়ীরই কদমতলী এলাকায় নিজের দোকানে বসে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবসায়ী আসলাম খানকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় জমি নিয়ে পুরনো শত্রুতার জেরে।
ভাগ্য ভালো, স্থানীয়রা সাহস দেখিয়ে হামলাকারীকে পিস্তল, রিভলবার ও ৯ রাউন্ড গুলিসহ হাতেনাতে ধরে পুলিশে দেন।
শুধু রাজধানী নয়, মিরপুর, কাফরুল, নরসিংদীর পলাশ সহ দেশের নানা প্রান্তেই একই চিত্র।
চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের ওপর গুলি চালানো, কাফরুলে যুবদল কর্মী ইউসুফ বেপারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে মৃত্যু, কিংবা নরসিংদীতে দলীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা ইব্রাহীম মাসুমের গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারানো, এসবই একই ধারাবাহিকতার অংশ।
উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দেশে পাঁচটি গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আরো পড়ুন- ২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা – কেন প্রকাশ করা হয়েছিল এবং কারা ছিলেন আলোচনায়
সংখ্যায় সংকট: পরিসংখ্যান যা বলছে
পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই, এই ছয় মাসে সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় এক লাখ মামলা হয়েছে, যা তার আগের ছয় মাসের তুলনায় প্রায় এগারো হাজার বেশি।
এর মধ্যে হত্যা মামলাই হয়েছে সতেরোশোর বেশি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যও উদ্বেগজনক,
বছরের প্রথম সাত মাসে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ জনই মারা গেছেন গুলি বা সরাসরি আক্রমণে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর সাধারণ অপরাধ, দুই ক্ষেত্রেই অস্ত্রের ব্যবহার একসঙ্গে বেড়ে চলেছে।

অস্ত্র আসছে কোথা থেকে
এই সংকটের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান উৎস। প্রথমত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল।
এত সময় পরও এর মধ্যে ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি, যার মধ্যে রয়েছে ১০৯টি চাইনিজ রাইফেল ও ৩০টি সাবমেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্রও। সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ রাউন্ড গুলি।
এই বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ আন্ডারওয়ার্ল্ড, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চলে যাওয়ায় তা এখন সরাসরি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় উৎস সীমান্তপথ। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ৩০টি রুট দিয়ে নিয়মিত বিদেশি পিস্তল ও রিভলবার দেশে ঢুকছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে উঠে এসেছে।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সীমান্তভিত্তিক একাধিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন লাইসেন্সধারী কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ীও, যারা বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ পথে অস্ত্র সরবরাহ করছেন।
অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু সীমান্তের ফাঁকফোকর নয়, বৈধ লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও এখানে সমান দায়ী।
কেন থামছে না এই বেপরোয়া প্রবণতা
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেছেন, বর্তমানে দেশজুড়ে ঘটা বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত অবৈধ কিংবা লুণ্ঠিত অস্ত্র।
তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যতদিন এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থেকে যাবে, ততদিন তারা তা বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করতেই থাকবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই দ্বিধায় ভোগে, আর এই দ্বিধাই অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।

গ্রেফতার হলেও নানা ফাঁকফোকর দিয়ে পার পাওয়ার একটি চক্র সমাজ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গড়ে উঠেছে বলেও তার পর্যবেক্ষণ।
অপরাধীদের মনে যখন এই বিশ্বাস জন্মায় যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব, তখন তারা আর কোনো রাখঢাক না রেখে প্রকাশ্য দিবালোকেই শক্তি প্রদর্শন করতে দ্বিধা করে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান চলছে এবং তথ্য দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, প্রায়ই আসামি গ্রেফতার হলেও অস্ত্রের মূল জোগানদাতাদের নাম শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায় না, ফলে সরবরাহ চক্রটি অক্ষতই থেকে যায়।
উপসংহার: জবাবদিহিতা ছাড়া সমাধান নেই
পরিসংখ্যান আর একের পর এক ঘটনা মিলিয়ে যে চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং একটি কাঠামোগত সংকট।

সমাধানের পথ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপেই নিহিত। লুট হওয়া বাকি অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান চালাতে হবে।
সীমান্তের অন্তত ৩০টি চিহ্নিত রুটে নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং লাইসেন্সধারী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমেও কঠোর জবাবদিহিতা আনতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অস্ত্রধারী ও তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে সমান আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
যতদিন সরবরাহ চক্রের মূল হোতারা আড়ালেই থেকে যাবেন, ততদিন রাজপথে গুলির শব্দ থামার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
নাগরিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, আইনের চোখে সত্যিই কেউ ঊর্ধ্বে নয়।
মোহাম্মদ মহসীন- প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক













