ডিএমপির সাবেক কমিশনার
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান। কোলাজ ইত্তেফাক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে নৃশংসভাবে গুলি এবং আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আদালত।

মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া একজনকে যাবজ্জীবন এবং গ্রেপ্তার থাকা অপর আসামিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ রোববার (২৮ জুন ২০২৬) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যunal-এর অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

বিটিভি-তে সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায়টি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় পঞ্চম মামলার রায়

কারা পেলেন কী শাস্তি?

  • মৃত্যুদণ্ড (৩ জন): ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিঞ্চার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। দণ্ডপ্রাপ্ত এই তিন জনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। (উল্লেখ্য, এর আগে চানখাঁরপুলের আরেকটি হত্যা মামলায়ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল)।
  • যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (১ জন): রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
  • ২০ বছরের কারাদণ্ড (১ জন): রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার। তিনি এই মামলার একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি।

যে বিভীষিকাময় ঘটনার বিচার হলো

প্রসিকিউশনের তথ্য ও মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনের নামে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পুলিশি তাণ্ডব ও গুলি থেকে প্রাণ বাঁচাতে ১৮ বছরের তরুণ হোটেল কর্মচারী আমির হোসেন পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে উঠে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন।

পুলিশ সেখানেও পিছু ধাওয়া করলে বাঁচার আকুতিতে তিনি ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন। এ সময় আসামিরা তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন, অন্যথায় ওপর থেকেই তার শরীর লক্ষ্য করে পরপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়।

অলৌকিকভাবে আমির হোসেন বেঁচে গেলেও গুরুতর ও আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেন। একই দিন ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে মো. নাদিম (৩৮) এবং নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে দাদি মায়া ইসলাম (৬০) নামের দুই জন নিরীহ নাগরিক নিহত হন।

মামলার বিচারিক টাইমলাইন

তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এই মামলার প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের পর ২৩ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি শেষ হয়।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রাখা হয়েছিল। একাধিকবার তারিখ পরিবর্তনের পর অবশেষে আজ এই বহুল প্রতীক্ষিত মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।