ফার্মেসির কাউন্টারে প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে দিলেন। ওষুধ বের করে দোকানি বললেন, “বত্রিশ টাকা পিস।” পাশে দাঁড়ানো এক অভিজ্ঞ ক্রেতা নিচু গলায় বললেন, “এই একই জিনিস তো আট টাকাতেও পাওয়া যায়।” গল্পটা বানানো নয়।
ওষুধের দামের পার্থক্য বাংলাদেশে এখন এমন এক বাস্তবতা, যা নিয়ে প্রায় সবাই জানেন, অথচ ভুগতে হয় কেবল রোগীকেই।
সময় টিভির একটি প্রতিবেদনে এই চিত্রই উঠে এসেছে। সেই প্রতিবেদনের তথ্য ধরে আমরা খুঁজে দেখব, ফারাকটা আসলে কোথা থেকে আসে, কার লাভ হয় আর কার পকেট কাটা যায়।
একই জেনেরিক, দাম দুই থেকে তিন গুণ
জেনেরিক মানে ওষুধের মূল উপাদান। একই উপাদান, একই মাত্রা, একই কাজ, কিন্তু বাজারে নাম আলাদা, কোম্পানি আলাদা, দামও আলাদা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিভেদে একই জেনেরিকের ওষুধের দাম দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত ভিন্ন হয়।
উদাহরণও চোখে পড়ার মতো:
- হার্টের একটি ট্যাবলেট এক কোম্পানির কাছে প্রতি পিস ৩২ টাকা। একই জেনেরিকের ট্যাবলেট অন্য কোম্পানি বিক্রি করছে ৮ টাকায়।
- মেরোপেনাম ইনজেকশনের গায়ের দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ অনেক ফার্মেসিতে একই ইনজেকশন ৭০০ থেকে ৭১০ টাকায় মেলে।
দাম অর্ধেক কিংবা তারও কম, চিকিৎসাগত কাজ একই। তাহলে বাড়তি টাকাটা কীসের বিনিময়ে?
কাঁচামাল এক জায়গা থেকেই, তাহলে ফারাক কীসের
ওষুধ শিল্প সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় সব কোম্পানিই কাঁচামাল সংগ্রহ করে একই উৎস বা নির্দিষ্ট মানসম্পন্ন জায়গা থেকে। অর্থাৎ ভেতরের উপাদানে বড় কোনো পার্থক্য নেই।
তাহলে দাম আলাদা হচ্ছে কেন? প্রতিবেদনে কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তিনটি বিষয়: ব্র্যান্ডিং, কোম্পানির প্রমোশনাল খরচ আর মুনাফা নিয়ে অসম প্রতিযোগিতা।
বেশি দামের কোম্পানিগুলোর কেউ কেউ যুক্তি দেয়, তারা ইউরোপীয় উৎস থেকে কাঁচামাল আনে কিংবা প্রচারে বেশি ব্যয় করে। কিন্তু সাধারণ রোগী প্রশ্ন করতেই পারেন, প্রচারের খরচ মেটানোর দায় কেন তাঁর?
সহজ করে বললে, রোগী অনেক সময় ওষুধের চেয়ে ওষুধের নামটার জন্যই বেশি টাকা দিচ্ছেন।
কম দামি মানেই খারাপ, এই ধারণা কতটা ঠিক
বাজারে একটা প্রচলিত ধারণা আছে: দাম বেশি মানে ভালো, দাম কম মানে সন্দেহজনক। ওষুধ প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ঠিক উল্টো। তাঁদের মতে, কম দামি ওষুধ মানেই নিম্নমানের নয়।
সরকারি মনিটরিং কঠোর থাকায় কম দামের ওষুধের মান নিয়েও শঙ্কার কারণ নেই বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে এমন সচেতন রোগীদের কথাও এসেছে, যাঁরা কম দামের ওষুধ খেয়েই দিব্যি সুস্থ আছেন। তবে একটা কথা পরিষ্কার থাকা ভালো।
কম দামি ওষুধ বেছে নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া নিরাপদ, আর ওষুধ কেনার সময় প্যাকেটের নিবন্ধন, ব্যাচ ও মেয়াদ দেখে নেওয়া উচিত।
হাসপাতালের পাশের ফার্মেসি: ছাড়ের আড়ালের ছলচাতুরি
হাসপাতালের গেটের বাইরে সারি সারি ফার্মেসি। রোগী নিয়ে ছুটে আসা স্বজনের মাথায় তখন দরদামের চিন্তা থাকে না। প্রতিবেদন বলছে, হাসপাতালসংলগ্ন কিছু ফার্মেসিতে গায়ের দামের চেয়ে সামান্য কম রেখে ওষুধ বিক্রির এক ধরনের কৌশল চলছে।
ক্রেতা ভাবেন, ছাড় পাচ্ছি। কিন্তু যে ওষুধের গায়ের দামই অন্য সমমানের ওষুধের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি, তার ওপর সামান্য ছাড় আসলে কোনো সাশ্রয়ই নয়।
ছাড়ের আনন্দে রোগী বুঝতেই পারেন না, পাশের তাকেই একই উপাদানের অনেক কম দামি ওষুধ রাখা আছে। এটাই সেই নীরব প্রতারণা, যার কোনো অভিযোগও হয় না, কারণ ভুক্তভোগী টেরই পান না।
উপঢৌকন, প্রেসক্রিপশন আর পকেট খরচের চাপ
বিশেষজ্ঞদের একটি বড় দাবি হলো, ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের উপঢৌকন বা উপহার দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সব চিকিৎসককে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে।
অনেক চিকিৎসক পুরোপুরি নৈতিক অবস্থান থেকেই কাজ করেন।
কিন্তু উপহারের সংস্কৃতি টিকে থাকলে প্রশ্ন উঠবেই: প্রেসক্রিপশনে ওষুধটি কি রোগীর প্রয়োজনে লেখা হলো, নাকি অন্য কোনো বিবেচনায়?
প্রতিবেদনে সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটের কথাও এসেছে। প্রেসক্রিপশনে লেখা দামি ওষুধ কিনতে গিয়ে অনেক রোগী চাপে পড়েন। বাংলাদেশে চিকিৎসা খরচের বড় অংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, যাকে বলা হয় Out-of-pocket expenditure।
এই খরচের অনেকটাই যায় ওষুধ কিনতে। ওষুধের দাম একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে না এলে এই বোঝা কমবে না।
সরকারের কাছে কী চাওয়া হচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব স্পষ্ট: ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর মূল্য নির্ধারণী নীতিমালা চাই, যা সব পক্ষের আস্থা অর্জন করতে পারবে। সেই নীতিমালায় থাকতে পারে:
- কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা মূল্যের যৌক্তিক কাঠামো।
- একই জেনেরিকের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামের ফারাকের একটি গ্রহণযোগ্য সীমা।
- মার্কেটিং ও প্রমোশন খরচে স্বচ্ছতা।
- চিকিৎসক ও কোম্পানির মধ্যে উপহার-সুবিধা লেনদেনের তথ্য প্রকাশ।
- প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক নাম লেখার চর্চা উৎসাহিত করা।
- ফার্মেসিতে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, রসিদ প্রদান আর নিয়মিত তদারকি।
শিল্পকেও মাথায় রাখতে হবে। মূল্য নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে করা চাই, যাতে দেশের ওষুধ শিল্প দুর্বল না হয় অথচ রোগীর পকেটও রক্ষা পায়। নীতি কাগজে থাকলে চলবে না, প্রয়োগ আর লঙ্ঘনের শাস্তি নিশ্চিত করাই আসল পরীক্ষা।
আপনি আজ কী করতে পারেন
- ওষুধের জেনেরিক নাম জেনে নিন। প্যাকেটের গায়ে সাধারণত লেখা থাকে।
- ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুন, একই উপাদান ও মাত্রার আর কোন ব্র্যান্ড আছে।
- ব্র্যান্ড বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে ওষুধ পাল্টাবেন না।
- সব সময় রসিদ নিন।
- অতিরিক্ত দাম বা অনিয়মের অভিযোগ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে জানান।
শেষ কথা
৩২ টাকা আর ৮ টাকার ফারাক আসলে একটি বড় প্রশ্নের ইঙ্গিত দেয়: ওষুধ কি কেবলই বাজারের পণ্য, নাকি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন? ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাব, প্রমোশনের প্রতিযোগিতা আর তদারকির ফাঁকের দাম শেষ পর্যন্ত চুকাতে হয় রোগীকেই।
নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কোম্পানি আর চিকিৎসক সমাজ, সবাই মিলে এই ফাঁক বন্ধ না করলে সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা অধরাই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: সময় টিভির প্রতিবেদন (ভিডিও লিংক: https://youtu.be/f60puqKPNeo)












