আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
শুধু মার্কা নয়, ব্যক্তি দেখে ভোট দিন। এটি ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর প্রথম নির্বাচন, যেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার উল্টে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে যে ক্যাম্পেইন ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে এবং একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ নামক রাজনৈতিক সংস্কারের উপর রেফারেন্ডামও অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনে ভোটারদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: দলীয় মার্কা দেখে ভোট দেবেন, নাকি প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বিবেচনা করে? আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই যারা শুধু প্রতিশ্রুতি দেবেন না, বরং স্থানীয় আসনের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন। এই সম্পাদকীয়তে আমরা কয়েকটি মূল সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব, যা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির অবসান: একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি সর্বব্যাপী সমস্যা, যা অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরে ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রেডি-মেড গার্মেন্টস (আরএমজি) সেক্টরে চুক্তি, ক্রয়-বিক্রয় এবং ঘুষের মাধ্যমে দুর্নীতি ঘটে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। শুধু মার্কা নয়, ব্যক্তি দেখে ভোট দিন
একইভাবে, চাঁদাবাজি বা এক্সটর্শন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হবে এসব বন্ধ করা, যেমন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সরকারি কাজের মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা। যদি প্রতিটি আসনে দুর্নীতি দমন করা যায়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
নাগরিক মৌলিক অধিকার রক্ষা: বিদ্যুত, গ্যাস এবং রাস্তার সমস্যা
প্রতিদিনের জীবনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয় বিদ্যুত চুরি বা ভুতুড়ে বিলের কারণে। বাংলাদেশের বিদ্যুত সেক্টরে দুর্নীতি এবং চুরির ফলে লোডশেডিং এবং অতিরিক্ত বিল একটি সাধারণ সমস্যা। একইভাবে, গ্যাসের সরবরাহে অনিয়ম দেখা যায়, যা শিল্প এবং গৃহস্থালী উভয়কেই প্রভাবিত করে।
রাস্তা সংস্কারের কাজে দুর্নীতির কারণে অনেক এলাকায় রাস্তা ভাঙা থাকে, যা যানজট সৃষ্টি করে। জনপ্রতিনিধিদের উচিত স্থানীয় স্তরে এসব সমস্যার সমাধান করা, যেমন বিদ্যুত চুরি রোধে স্মার্ট মিটারিং সিস্টেম চালু করা এবং রাস্তা দখলমুক্ত করা। অতিরিক্ত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান প্রয়োজন, যা যানজট কমিয়ে নাগরিকদের জীবন সহজ করবে।
আরও পড়ুন- তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: রাজনীতি, বাস্তবতা ও জনগণের প্রশ্ন
মাদক নির্মূল এবং সুস্থ সমাজ গঠন
মাদক একটি জাতীয় বিপর্যয়, যা যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান এবং বিতরণে দুর্নীতি জড়িত, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যুক্ত। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হবে স্থানীয় স্তরে মাদক নির্মূল অভিযান চালানো, যেমন কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম এবং আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করা।
এছাড়া, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ একটি জরুরি ইস্যু; বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি বা ভাড়াটিয়াদের হয়রানি বন্ধ করতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে সমাজ আরও সুস্থ এবং নিরাপদ হবে।
পরিবেশ রক্ষা এবং উন্নয়ন: গাছ লাগানো থেকে পার্ক নির্মাণ
সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব। বাংলাদেশে পরিবেশগত প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিটি আসনে গাছ লাগানো, খেলার মাঠ এবং পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়ন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, শহুরে এলাকায় সবুজ স্থান বাড়ানো যুবকদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সাহায্য করবে এবং পরিবেশ দূষণ কমাবে। এসব উদ্যোগ নিলে দেশ আরও সুন্দর এবং টেকসই হবে।
উপসংহারে বলা যায়, ২০২৬ জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের সচেতনতা দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। দলীয় মার্কা দেখে নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি বিবেচনা করে ভোট দিন।
যদি প্রতিটি আসনে এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় যারা দুর্নীতি দমন, মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করবেন, তাহলে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হবে। এই নির্বাচন আমাদের সুযোগ দিচ্ছে সত্যিকারের পরিবর্তন আনার – সেই সুযোগ কাজে লাগান।
— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক।







