রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে সরকার। আইন লঙ্ঘন করে হাসপাতাল পরিচালনা করায় কেন প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) এই নোটিশ ইস্যু করে তা হাসপাতালের মূল গেটে ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগামী রোববার বিকেল ৫টা পর্যন্ত (৭২ ঘণ্টা) সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে。
মৃত্যুর মূল কারণ: বদ্ধ ঘরে এসি বন্ধ ও অক্সিজেনের অভাব
বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের বরাত দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, মূলত এসি বন্ধ থাকা, অক্সিজেন স্বল্পতা, ধারণক্ষমতার চেয়ে ছোট কক্ষে অতিরিক্ত রোগী রাখা এবং চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণেই এই গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন:
“সম্ভবত মৃত্যুর মূল কারণ ছোট কক্ষে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা। প্রয়োজনীয় এসি না চলায় ওই ওয়ার্ডে তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতা তৈরি হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যায়। এছাড়া পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চরম অবহেলার কারণেই এই ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই অবহেলা স্পষ্ট প্রমাণিত।”
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ৫টি বিস্ফোরক তথ্য
এর আগে গত বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি এবং বৃহস্পতিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটি তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেয়। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতালের ভয়াবহ কিছু চিত্র উঠে এসেছে:
- অনুপযুক্ত ভবন: যে ভবনটিতে আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে, সেটি আসলে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।
- অক্সিজেন সংকট ও নার্সদের নিষ্ঠুরতা: বদ্ধ কক্ষে অক্সিজেন কমে কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গিয়েছিল। আশঙ্কাজনক অবস্থায় অভিভাবকরা বারবার আকুতি জানালেও কর্তব্যরত নার্সরা কোনো সহযোগিতা করেনি।
- ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী: পোস্ট অপারেটিভ ও আইসিইউ ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল।
- কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা: হাসপাতালটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো উপযুক্ত বা জরুরি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
- ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ: ভবিষ্যতে যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার আগে ভবনটি শতভাগ উপযুক্ত কি না, তা কঠোরভাবে পরিদর্শনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
মামলা হলেও এখনো অধরা আসামিরা
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর দিন অর্থাৎ ২৮ মে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ঘটনার এত দিন পেরিয়ে গেলেও এবং তদন্ত প্রতিবেদনে দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও এখনো পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
বিদ্যমান ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ’ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে এখন হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র: সমকাল










