বাংলাদেশে সহজ শর্তে স্মার্টফোন কেনার কিস্তি সুবিধা যখন সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে, ঠিক তখনই ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম PalmPay Bangladesh Limited-এর বিরুদ্ধে চরম হয়রানি ও অনৈতিক বকেয়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন পাবলিক রিভিউ প্ল্যাটফর্মে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের দীর্ঘ অভিযোগ থেকে জানা যাচ্ছে- কিস্তি পরিশোধে সামান্য দেরি হলেই গ্রাহকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত ছবি অপব্যবহার করে সামাজিক সাইটে ‘প্রতারক’ বানানোর হুমকি এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি চরম অশালীন আচরণের ঘটনা ঘটছে।
পামপে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে এক বছরের পাইলট প্রজেক্টের অধীনে ১০ হাজার স্মার্টফোন ফাইন্যান্সিংয়ের উদোগ নেয়। তবে এই সম্প্রসারণের সাথে সাথে তাদের রিকভারি এজেন্টদের সন্ত্রাসী কায়দায় গ্রাহক নিপীড়নের চিত্র জনসমক্ষে চলে এসেছে।
ছবি অপব্যবহার ও ‘প্রতারক’ বানানোর অপচেষ্টা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক অভিযোগে জানা যায়, কিস্তি দিতে বিলম্ব হলে কোনো যৌক্তিক বা আইনি সমাধানের পথে না হেঁটে গ্রাহকদের সরাসরি মানসিক ও সামাজিকভাবে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী সরাসরি ইনিউজ আপ এর প্রতিনিধিকে বলেন-
“আমি একটি ক্ষুদ্র বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করি। পামপে এর মাধ্যমে কিস্তিতে ফোন নিয়েছিলাম। ৪ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। ৭ কিস্তি দেয়া শেষ বাকি ২ কিস্তি। অনেক কষ্ট করে দেরী হোলেও কিস্তি দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তাদের ব্যাবহারে লজ্জা ও রাগ উঠে মনে হয় আমরা চোর বাটপার ফোন নিয়ে ভেগে যাচ্ছি। তাদের যতই বলি যে- ফোন তো লক করা, আমার প্রয়োজনেই আমি দ্রুত কিস্তি দিয়ে লক খুলবো। আমার কিস্তির তারিখ ১৫ তারিখ, কিন্তু ১৬ তারিখেই ফোন দিয়ে যা তা আচরণ। মহিলা আছে একজন সে খারাপ আচরণ করেন, তার নাম জানতে চাইলে নাম বলেন না। ২/৩ দিন পার হোলে পরিবারের স্ত্রী/মা/বাবাকে পুলিশের হুমকি দেওয়া হয়। সমস্যা তো হতে পারে, ফোন লক, কিস্তি দেরীতে হোলেও দেয়া হচ্ছে, তারপরও তাদের এমন আচরণ মেনে নেয়া যায় না। সারাদিনে ৪-৫ টা নাম্বারে কয়েকজন ফোন দেন। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা নেয়া উচিত, প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয়া উচিত। সুবিধার নামে তারা চড়া চার্জ বা সুদ নিচ্ছে আবার এরকম আচরণ করছে। এরা রক্তচোষা ও অসভ্য।”

আরেকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন,
“কিস্তি দিতে দেরি হলেও ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপমান করার হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
অন্য এক অভিযোগে উঠে এসেছে আরও লোমহর্ষক তথ্য। কিস্তির নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার আগেই রাতবিরাতে কল দিয়ে গ্রাহকদের মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়। আক্রান্ত এক গ্রাহক লিখেছেন:
“আমার মাকে ফোন করে যেভাবে কথা বলা হয়েছে, সেটা গ্রাহকসেবা নয়, সরাসরি অসম্মান।”

ব্যবসায়িক রিকভারি নাকি ডিজিটাল গুন্ডাগিরি?
প্রযুক্তি ও ফিনটেক সেবার আড়ালে গ্রাহকের ফোনের পার্সোনাল ডাটা, কনট্যাক্ট লিস্ট ও ছবি হাতিয়ে নিয়ে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা কেবল গ্রাহক সেবার মানদণ্ড লঙ্ঘন নয়, বরং সরাসরি মানবাধিকার ও আইনি সীমানার চুরমার রূপ।
অভিযোগের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণের বকেয়া আদায়ের সুস্পষ্ট নিয়ম ও আইনি পথ রয়েছে। তবে পরিবারকে টার্গেট করা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা গুরুতর অপরাধ ও ভোক্তা অধিকার হরণের শামিল।
“গ্রাহকের ছবি, পরিবার বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা গুরুতর consumer-protection issue।” – কনজিউমার রাইটস বিশেষজ্ঞ।

এদিকে স্থানীয় মোবাইল বিক্রেতারাও বলছেন, কিস্তি সুবিধা বিক্রি করা সহজ হলেও কালেকশন প্রসেস অনৈতিক ও কঠোর হলে গোটা ফিনটেক ইন্ডাস্ট্রির ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যাবে।
পামপের কাছে এসব অভিযোগ নিয়ে ইমেইলে ও ম্যাসেঞ্জারে তাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
পামপে কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে পামপে বাংলাদেশ লিমিটেড (PalmPay Bangladesh Limited)-এর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হলে তারা লিখিত বক্তব্যে জানান, কিস্তি আদায় কার্যক্রমে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তা ও রিকভারি এজেন্টের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘কোট অব কন্ডাক্ট’ বা নীতি নির্দেশিকা রয়েছে।
গ্রাহক বা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে হুমকি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মূল নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
গ্রাহকের ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির বিষয়ে পামপে দাবি করে, এ ধরনের কোনো আচরণ তাদের তথ্য সুরক্ষা (Data Privacy) ও নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অভিযোগ পাওয়া গেলে বা নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে গ্রাহকের গোপনীয়তা সুরক্ষার দোহাই দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা এজেন্টের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না- তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে পামপে জানায়, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের পাইলট কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত একটি প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নির্দিষ্ট কোনো ভুক্তভোগীর তথ্য বা অভিযোগ নম্বর দেওয়া হলে তা পৃথকভাবে তদন্ত করার আশ্বাসও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশনস টিম।
প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি
বিভিন্ন রিভিউ প্ল্যাটফর্মে পামপে-এর পেমেন্ট এরর, কাস্টমার সাপোর্ট না পাওয়া এবং আব্যবহারিক মেসেজিংয়ের অভিযোগ এখন অগণিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিংয়ের নামে পামপে-র এই অনৈতিক আচরণ রুখতে এখনই বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অন্যথায় গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা ও সার্বিক ফিনটেক সেক্টরে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।
–নিজস্ব সংবাদ













