Home মুক্তচিন্তা নারী দিবস নিয়ে কিছু কথা – জেসমীন আক্তার

নারী দিবস নিয়ে কিছু কথা – জেসমীন আক্তার

415
0
নারী দিবস

গত ৮মার্চ সারাদিনই দেখলাম নারীদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কখনো পিছিয়ে পড়ার কথা।কত রকমের দাবিদাওয়া, আহাজারির কথা।

ইদানীং আমার কোনো কিছুতে প্রমাণের চেষ্টা নিয়ে মাতামাতি করতে ইচ্ছে করে না।
নারী দিবসও নারীর জীবন জীবিকা, চালচলন নিয়ে প্রসারও প্রমাণের যেমন দাবীদার,তেমনই অন্তরায়ও।

এই দিবসটি মনে করিয়ে দেয়, নারী কতটা অবহেলিত, অসহায়, অবলা ছিল, আছে এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে,একেবারে নির্মুল হবেনা এও ভেবে নেয়া যায়।

আর যারা এগিয়ে গেছে, যাচ্ছে, তারা কি কোথাও থেকে ছাড় পেয়ে এগিয়েছে?
প্রশ্নটা আমার।
উত্তরটাও আমি-ই দেই…
না,তারা ছাড় পায়নি বরং অনেক গুণ বেশি যুদ্ধ করে লক্ষ্য পথে এগিয়েছে, একটা প্রতিষ্ঠিত পদে বসতে পেরেছে। তারপরই কি তারা সফল!
ঘরে বাইরে কাজের চাপে ক্লান্তির সঙ্গে আপোষ করে, হাসে বাঁচে, বাঁচায়,হাসায়…
আমার কাছে এটাই নারী!

“নারী” শব্দটাতে একটা ঐশ্বরিক শক্তি আছে, যা দশভুজা, যা ভেতরে আগুন উপরে ঢেউ ভাঙা নদীর মতো টলটলে।উর্বরা ফসলি মাঠ,দাবদাহে চৌচির হয়েও আবার সজীব হয়।এ নারীকে নতুন করে প্রমাণের প্রয়াসটাই আমার কাছে কেমন একটা আড়ষ্টতা বোধ হয়।
দাবী করি বা রাখি অনেকটাই না বুঝে।

চলতি ফিরতি পথে অনেক ঘটনাই দেখি,তারমধ্যে আমার খুব কাছের একজন আপনজনের একটা কথাই বলি…
ঘটনাক্রমে আমি উপস্থিত, সেই আপন জনের মেয়ে তখন ক্লাস নাইনে পড়ে, ওর মা বলছিল “আর তিন বছর পর আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিব,আমার নিজের মা আমার ছোট বোনকে পড়াতে গিয়ে বিয়ের অনেক দেরী করে ফেলছে, আমি সেই ভুল করবো না”।

ভেতরের বিরক্তিটা হয়তো আমার চোখে মুখেই প্রকাশ পেয়েছিল, আমি বলেই ফেলেছিলাম অনেকটা দাবি নিয়েই, তাহলে তো এই বিয়েতে আমি থাকবো না।সেও তৎক্ষনাৎ আমাকে হতাশ করে বলেছিল, না থাকলে না থাকবেন, আমি ভুল করতে রাজি না।

এটা একটা উদাহরণ, এরকম অনেক জায়গায় অনেক রকম ঘটনাই দেখি।
এখানে প্রতিবন্ধকতা একজন পুরুষ নয়,একজন নারীই।
নারীই শিক্ষা দেয় আমি তোর বাবার সংসার অনেক কষ্ট করেছি,এমনই করতে হয়,তুইও করবি।
নারীই শিক্ষা দেয় সহ্যই ধৈর্যের ফল,মেনে চলবি।

নারীই শিক্ষা দেয় রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সোজা হয়ে নয় মাথা নিচু করে হাঁটতে।
একজন বিধবা কিংবা ডিভোর্সি নারী যখন জীবন যুদ্ধে অন্যদের সাথে সমানতালে এগিয়ে চলার প্রাণপন চেষ্টায়, তখন ধারালো নখর যুক্ত পুরুষের খুবলে খাওয়ার জাগ্রত ইচ্ছের পাশাপাশি সুশীল কিছু নারীও তাকে অশ্লীল কথা বলে পিছনে টেনে ধরার কাজও করে যায় অনায়াসে।

এমনও দেখা যায়, কোনো বিয়ে কিংবা শুভ কোনো অনুষ্ঠানের সামাজিক রীতি রেওয়াজে এরকম নারীদের অংশ গ্রহণ করতে দেয় না,এতে নাকি নতুন দম্পতির জীবনে অশুভ কিছু হতে পারে।এমন ধারণা কিংবা কুসংস্কার কোনো পুরুষের মধ্যে নয়, নারীরাই অন্য নারীকে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, তারা কতটা অপয়া।

সে-ই নারীরাই আবার নারী দিবসে জয়ধ্বনি তুলতে থাকে।
তাহলে দাবী টা কার কাছে?
রাষ্ট্র, সমাজ না পরিবার ?
একটা প্রতিষ্ঠিত নারী কত কাঠখড় পুড়িয়ে একটা আসনে বসার পর সে সম্মান, স্যালুট পায়।
এখানেও যে না পায়,ইচ্ছা অনিচ্ছায় হোক কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে কখনো বা কটু কথা বলে পেঁচিয়ে ধরবেই,এগুলো করাও হিংসাকাতরতা,এগুলোও অশিক্ষারই অংশ।

এগিয়ে চলার পথে সমস্ত অন্তরায় মানুষের দূর্বল মনোবল, দূর্বল ইচ্ছে শক্তি, পরিবারের সাপোর্টের অভাব।

যে পরিবার নিজেই দায়িত্ব নিতে চায় না একজন মেয়ের, বিয়ে দিয়ে ফরজ আদায় করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে যায়,তাহলে অন্য পরিবারে বেড়ে ওঠা লোকজন সেই আনাড়ি, অবলা মেয়েকে যাতা কলে পিষে শেখাবে,বলাবে,গৃহ কর্মে পটিয়সি করবে,এইতো হয়, হচ্ছে,হবে।

গতকাল দেখলাম, প্রিন্স চার্লস এর পরকিয়ার কথা জেনে তার সুন্দরী স্ত্রী প্রিন্সেস ডায়নার ইতিহাস অনেকেই তুলে ধরেছেন।

এখানে আমার প্রশ্ন, পুরুষেরা পরকিয়া কার সাথে করছে,অবশ্যই কোনো নারীর সাথে, যে নারী জেনে বুঝে এগিয়ে থাকে ওই পুরুষের সংসার সন্ততি থাকার পরও।
দ্বিতীয় প্রশ্ন প্রিন্সেস ডায়না সুন্দরী ছিলেন, এটা ঠিক কিন্তু যে নারী বাহ্যিক দিক দিয়ে কিছুটা নিষ্প্রভ,কম সুন্দর সে নারীর স্বামী পরকিয়ায় জড়ানো কি স্বাভাবিক?
আমরা কি বলছি, কি করছি এটাও ভাবনার বিষয়।

যে স্বাধীনতা আপন মা বাবা-মা ভাই দেয় না,তাই আশাকরি অন্য মায়ের পালিত সন্তানের কাছে।যার চিন্তা ভাবনা, আচার আচরণ হবে তার নিজস্ব পরিবেশে বেড়ে ওঠার ওপরে, এখানেও সাইকোলজি অনেক কিছু বহন করে।যে ছেলে নিজে দেখেনি তার মায়ের সম্মান তার বাবার কাছে,সে শিক্ষাটা তারও পাওয়াই স্বাভাবিক। এও দেখা যায় মা কিংবা বোনের কাছে ছেলে অথবা ভাই বউকে একটু টেক কেয়ার করলে তাদের ভালো লাগে না,এগুলো সমাজের চিরাচরিত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

কর্মক্ষেত্রেও খেয়াল করলে দেখা যায় পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে নারী সহকর্মীই একজন আরেক জনকে খোঁচায় বেশি।

একটা সময় ছিল, খেতে চাইতাম না,মা আমার মেরে ধরে খাওয়াতো। আমি খাবার চিবোতাম মা দেখতো,খাবার গিলতাম তাও দেখতো কিন্তু পেট ভরতো আমার মায়ের, চেহারার তৃপ্তি দায়ক হাসি দেখে তাই মনে হতো। এও বলতো এখন কার পেট ভরলো?

জীবন চলার পথে ওইটুকু আবেগময় স্মৃতি খুব অল্প সময়ের বাকী সময়টুকু পুরোই সংগ্রামের, এটাই জীবন, বেঁচে থাকা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায়,একটা শিক্ষিত মায়ের শিশুর শৈশব কাটছে চাইল্ড হোমে, একজন বৃদ্ধর বৃদ্ধাবস্থা সঠিক টেককেয়ার করার মতো মানুষের অভাবে কাটছে বৃদ্ধাশ্রমে।

কিন্তু যৌবনমতী নারী একলা থাকতে পারছে না,কোথাও না কোথাও আপোষ করে থাকতে হচ্ছে। সেটা হয় স্বামীর সাথে, নয় বাবা কিংবা ভাইয়ের সংসারে যেখানে সে আরও অবাঞ্চিত অবহেলিত।
নারীদের নিয়ে কোনো দাবী করতে হলে একলা থাকার ক্ষমতায়নের দাবী করা হোক।
কন্যা,জায়া,জননীর চলাফেরার নিরাপত্তা দাবী করা হোক।

আমি নারী,কিছুটা প্রতিবন্ধকতা না বলে বাড়তি কিছু শারীরবৃত্তীয় গুণাবলি নিয়েই আমার জন্ম,যা কখনো পিছিয়ে দেয় আবার সৃষ্টি সুখের উল্লাসে অনেক গুণ এগিয়ে থাকি।
আমি যেমন পারদের মতো টুকরো টুকরো হতে পারি আবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে জুড়তেও পারি।
কোমল কঠোরে আমি টাকে খুব ভালো বাসতেও পারি।

আমার জন্য কোনো নারী দিবস নেই, প্রতিদিনই আমি উদযাপন করি,কখনো নীরবে কখনো সরবে।

লেখাঃ জেসমিন আক্তার