১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এক অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভোটের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, অথচ ভোটারদের মুখে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই। কে কাকে ভোট দেবেন, কোন দিকে জনমত ঝুঁকছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
এই নীরবতা অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হলেও বাস্তবে এটি দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণের এক ধরনের সচেতন সংযম। মানুষ এবার আবেগে নয়, হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারা একক কোনো রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারছে না। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটার প্রায় সাড়ে চার কোটির বেশি। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে এই তরুণদের বড় একটি অংশ এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা তৈরি হয়েছিল, পরিবর্তনের বড় চালিকাশক্তি হবে তারাই।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তরুণ সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী ছাত্র রাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট যে তরুণরা অভিন্ন কোনো রাজনৈতিক বয়ানে একত্রিত নয়। জুলাই আন্দোলনে তারা সাময়িকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী লক্ষ্যে, কিন্তু আন্দোলন শেষে প্রত্যেকে নিজ নিজ দলীয় ও আদর্শিক অবস্থানে ফিরে গেছে। ফলে সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোট এক বাক্সে যাবে না, এটি প্রায় নিশ্চিত। তাই তরুণরা বড় সংখ্যা হলেও ফল নির্ধারণে তারা একক ও সিদ্ধান্তমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে না।
এইচ. এম. এ. হক মেহমেদ এর আরেকটি লেখা পড়ুন- নারী প্রার্থী সংখ্যার সংকট, সম্ভাবনার প্রাচুর্য
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠেন নারী ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখের বেশি। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত দুর্বল। প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৮০ জন, যা মোট প্রার্থীর চার শতাংশেরও কম। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারীর অংশ আরও কম। ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩৫টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। এটি শুধু সংখ্যাগত বৈষম্য নয়, এটি রাজনীতিতে নারীর ভূমিকা নিয়ে দলগুলোর অনীহার নগ্ন প্রকাশ।
তবে প্রতিনিধিত্ব কম হলেও ভোটের বাস্তব ক্ষমতা নারীদের হাতেই থাকে—এটি বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন পাওয়া যায়। ১৯৯১ সালে নারী ভোটারদের বড় অংশ যে দলকে সমর্থন করেছিল, সেই দলই সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে নারীদের ভোট সরে যাওয়ায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ২০০১ সালে পুরুষ ভোটে ব্যবধান সামান্য হলেও নারী ভোটের ভারসাম্যই সরকার গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। অর্থাৎ নারী ভোট কেবল সহায়ক নয়, বরং নির্ধারক।
এই ধারাবাহিকতার পেছনে একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা কাজ করে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের বাইরে সাধারণ নারী ভোটারদের জীবন অভিজ্ঞতা অনেকটাই অভিন্ন। শহর বা গ্রাম, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত—অধিকাংশ নারী প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হন। এই অভিন্ন অভিজ্ঞতা তাদের রাজনৈতিক ভাবনাতেও একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তারা ব্যক্তিগত ক্ষমতা, নিরাপত্তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। ফলে নারীদের ভোট ভাবনা অনেক সময় পুরুষ ভোটারদের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী ও দীর্ঘমেয়াদি হয়।
এই বৈশিষ্ট্য শুধু নির্বাচনে নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসেও প্রতিফলিত। ৯০-এর গণ–অভ্যুত্থানে চূড়ান্ত মোড় আসে নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার থেকে শুরু হয়ে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনেও নারীরা ছিলেন সামনের সারিতে। রাজপথে নেতৃত্ব, সংগঠনে সক্রিয়তা, আন্দোলনের লজিস্টিক সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই নারীদের ভূমিকা ছিল নির্ধারক। অথচ আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সেই অবদান প্রায়ই অস্বীকৃত থেকে গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২৪-এর আন্দোলনের পর নারীদের সামাজিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে সহিংসতা ও নির্যাতন। নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগ—এই প্রশ্নগুলো আজও নারীদের সামনে অনুত্তরিত। ফলে এবারের নির্বাচনে নারীরা শুধু দল নয়, বরং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন।
নারীরা সাধারণত উচ্চকণ্ঠে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেন না। তারা পর্যবেক্ষণ করেন, হিসাব করেন এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেন। ইতিহাস বলে, তারা সিদ্ধান্তে খুব কমই ভুল করেন। তাই এবারের নির্বাচনে প্রকৃত শক্তির ভারসাম্য কোথায়, তা বুঝতে হলে নারী ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণ করাই সবচেয়ে জরুরি।
এই বাস্তবতায় বলা যায়, এবারের নির্বাচনে মসনদের চাবি কোনো স্লোগান বা তরুণ আবেগের হাতে নয়, বরং নীরব, অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী নারী ভোটারদের হাতেই। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বাক্সে তাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর রাষ্ট্রক্ষমতার দিকনির্দেশনা।
এইচ. এম. এ. হক মেহমেদ
ফাউন্ডিং ডিরেক্টর
পলিসি বক্স
গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক







