Home মুক্তচিন্তা সংখ্যালঘু ভোটার ও নির্বাচনী নিরাপত্তা: গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত

সংখ্যালঘু ভোটার ও নির্বাচনী নিরাপত্তা: গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত

328
0
সংখ্যালঘু ভোটার ও নির্বাচনী নিরাপত্তা

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা বারবার লক্ষ করা যায়—ভোটের আগে ও পরে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে, সাম্প্রতিক সময়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন সহিংসতার অভিযোগ সামনে এসেছে, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এ কথাও সত্য যে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত বা অপতথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়। তবে বাস্তব সহিংসতা ও ভয়ের পরিবেশকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ঘটনায় দ্রুত ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়ার অভাব। অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিলেও, সামগ্রিকভাবে একটি সুসংহত ও দৃশ্যমান নিরাপত্তা কৌশল এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভোটার উপস্থিতির ওপর। সংখ্যালঘু ভোটাররা যদি নিরাপত্তার আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হন, তাহলে তা শুধু তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না; বরং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করবে। সম্প্রতি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ যে সংবাদ সম্মেলনে ‘জীবন, জীবিকা, সম্পদ ও সম্ম্রম’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সেটি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের কেন এই ভয় ও আতঙ্কের মুখে পড়তে হবে—এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে প্রায় ৮০টি সংসদীয় আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা ফলাফলে প্রভাব রাখতে পারেন। অর্থাৎ তারা কেবল সংখ্যাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নন; অনেক ক্ষেত্রেই তারা নির্বাচনী ফল নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে এক ধরনের দ্বিচারিতা স্পষ্ট। নির্বাচনী ইশতেহার ও বক্তৃতায় গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হলেও, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে দৃশ্যমান অঙ্গীকার ও কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়ে গেছে। প্রার্থী তালিকাও সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মাত্র ৮০ জন, যা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিন পর তুলনামূলক উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সংখ্যালঘু ভোটাররাও অন্য নাগরিকদের মতোই ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সামনে রয়েছে একটি দ্বিধাজনক বাস্তবতা—ভোট দিতে গেলে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, আর ভোট না দিলে রাজনৈতিকভাবে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা। এই দ্বিধা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। যেসব আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারেন, সেসব এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু প্রার্থীরা যেন সমানভাবে প্রচারের সুযোগ পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। সংখ্যালঘুদের কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিহার করে তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। সহিংসতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং দৃষ্টান্তমূলক আচরণই পারে সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

নিরাপদ ও ভয়হীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তেমনি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনই সময়, এই দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার অবসান ঘটাতে দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

এইচ. এম. এ. হক মেহমেদ
গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক
ফাউন্ডিং ডিরেক্টর
পলিসি বক্স