বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা একটি গভীর, সমাজব্যাপী সংকট। বিষয়টি শুধু আইনি বা প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়—এটা সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক মনোভাব ও সম্মিলিত দায়িত্বের অভাব প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞ বক্তব্য অনুসারে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরো ভয়ংকর।

২০২৪ সালের বাস্তব চিত্র

  • নারীর প্রতি সহিংসতা: জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে—বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত এক বছরে সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪১ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বেশি ঘটছে মানসিক নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, যা অনেক সময় শারীরিক বা যৌন সহিংসতার চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি করছে।

  • শিশুর প্রতি সহিংসতা: ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই (১–১৪ বছর বয়সী) নিয়মিতভাবে পরিবারের ভেতরে শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়। অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি শিশু প্রতি মাসে এ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

  • দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অবস্থা আরও ভয়াবহ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের ৭৪ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।

২০২৩ সালের বাস্তবচিত্র

  • বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সারা দেশে ৫,৪০০ জন নারী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে প্রায় এক হাজারের বেশি।
  •  বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালে প্রায় ১,২০০ শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি এখন সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

সমস্যার মূল কারণ

১. সামাজিক সচেতনতার অভাব – পরিবারে সন্তানকে ছোট থেকেই শেখানো হয় না নারী ও শিশুর প্রতি সম্মান ও সমতার মূল্যবোধ।
২. আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা – অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানাতে ভয় পান বা বিশ্বাস করেন না যে ন্যায়বিচার পাবেন।
৩. গণমাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনার ঘাটতি – প্রচার হয় ঘটনা, কিন্তু প্রতিরোধ বা সমাধান নিয়ে টেকসই প্রচারণা কম।
৪. অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ – দারিদ্র্য, বেকারত্ব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে পরিবারে সহিংসতা বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞ মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিনা আক্তার বলেন—

“নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু অপরাধ নয়, এটি সমাজের মানসিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। আইন শক্তিশালী হওয়া দরকার, তবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি।”

করণীয়

  • দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইন প্রয়োগ – প্রতিটি সহিংসতার মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

  • শিক্ষা ব্যবস্থায় সচেতনতা – স্কুল-কলেজে লিঙ্গ সমতা ও মানবিক আচরণের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

  • গণমাধ্যমের ভূমিকা – শুধু খবর নয়, সমাধানমুখী প্রচারণা চালানো জরুরি।

  • সমাজ ও পরিবারকে সম্পৃক্ত করা – প্রতিবেশী, আত্মীয় বা বন্ধুরা যদি সহিংসতা দেখেন, তবে চুপ না থেকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তিনটি দিককে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে—

  1. দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ – অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

  2. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি – পরিবার ও বিদ্যালয় থেকেই ছেলে-মেয়েকে সমান মর্যাদা শেখাতে হবে।

  3. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা – সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে ইতিবাচক প্রচারণার জন্য।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। আর শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

তাই এখন সময়— সামাজিক উদাসীনতা ও সচেতনতার অভাব কাটিয়ে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা শুধু তাদের অধিকার নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার অপরিহার্য শর্ত।

— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক