পাঠাও চালকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ
ধর্ষক নিপু

গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় মাধ্যম রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’। তবে সেই অ্যাপের সূত্র ধরে তৈরি হওয়া সাধারণ পরিচয়ই যে এক তরুণীর জীবনে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। এক পাঠাও চালকের ওপর সরল বিশ্বাস রাখার চরম মাশুল দিতে হলো ২২ বছর বয়সী এক তরুণীকে।

রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন হোটেল সোনারগাঁও ভবন সংলগ্ন একটি বেসরকারি কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠানের ফাঁকা অফিসে আটকে রেখে ওই তরুণীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনায় মূল ধর্ষক ও পাঠাও চালক মোঃ নিপুকে (২৪) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

যেভাবে ফাঁদে ফেলা হলো তরুণীকে

মামলার এজাহার ও এফআইআর (FIR) থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ মে। ভুক্তভোগী ওই তরুণী অনলাইন রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর মাধ্যমে চালক মোঃ নিপুর মোটরসাইকেলে চড়ে উত্তরা থেকে নিজের গন্তব্যে যান। সেই সুবাদে তাদের মধ্যে সাধারণ পরিচয় ও মোবাইল নম্বর বিনিময় হয়।

পরবর্তীতে গত ৫ জুন চালক নিপু হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে তরুণীর খোঁজখবর নেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তরুণী জানান যে, পরদিন (৬ জুন) কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ইউসিবি একাডেমিতে তাঁর একটি ক্লাস রয়েছে। পরিচিত ও পেশাদার চালক মনে করে সরল বিশ্বাসে তরুণী ওই প্রস্তাবে রাজি হন।

কৌশলে মিষ্টির দোকানে বসিয়ে রেখে অফিসে নিয়ে ধর্ষণ

গত ৬ জুন পরীক্ষা শেষে দুপুর আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে চালক নিপু কৌশলে অন্য এক বন্ধুর মোটরবাইক আনার অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করেন এবং তরুণীকে কারওয়ান বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে বসিয়ে রাখেন। বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে নিপু তাঁর মোটরবাইকটি হোটেল সোনারগাঁওয়ের পার্কিংয়ে রাখা আছে জানিয়ে তরুণীকে সাথে নিয়ে হোটেল চত্বরে প্রবেশ করেন।

সেখানে গাড়ি না নিয়ে তিনি হোটেল সোনারগাঁওয়ের ৩নং গেটের পাশে অবস্থিত ‘Bangladesh Business Consulting’ নামক অফিসে তরুণীকে নিয়ে প্রবেশ করেন। অফিসে প্রবেশের পর সেখানে উপস্থিত নিপুর সহযোগী মোঃ সোহেল রানা (২৯) তরুণীর সাথে পরিচিত হন এবং চা-কফির অফার করেন।

কিছু সময় পর সোহেল রানা অফিসের অন্য রুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে থেকে মেইন দরজা লক করে দেন। এরপর ফাঁকা অফিসে পাঠাও চালক মোঃ নিপু তরুণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর সহযোগী সোহেল রানা কক্ষে প্রবেশ করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

কৌশলে ধর্ষককে ধরে দিল ভুক্তভোগী তরুণী

ঘটনার পর লোকলজ্জা এবং আসামিদের হুমকির কারণে ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিক মামলা করতে পারেননি। তবে দমে যাননি ওই তরুণী। গত ৭ জুন রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে তিনি কৌশলে প্রধান আসামি নিপুকে তুরাগ থানা এলাকায় ডেকে নিয়ে আসেন। সেখানে নিপু ঘটনাটি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ পালানোর চেষ্টা করলে তরুণীর চিৎকারে স্থানীয় জনতা তাকে হাতেনাতে আটক করে।

সেখানে নিপু উগ্র মেজাজ ও বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়ে তুরাগ থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। পরবর্তীতে প্রাথমিক তদন্ত শেষে ঘটনাস্থল হাতিরঝিল থানা এলাকায় হওয়ায় তুরাগ থানা পুলিশ আসামিকে হাতিরঝিল থানায় হস্তান্তর করে।

আসামিদের বিবরণ ও আইনি পদক্ষেপ:

১নং আসামি (গ্রেপ্তারকৃত ধর্ষক): মোঃ নিপু (২৪), পিতা: মো: রুহুল আমিন শিকদার, পেশা: পাঠাও চালক। স্থায়ী ঠিকানা: বাউফল, পটুয়াখালী; বর্তমান ঠিকানা: কাওলা, বিমানবন্দর, ঢাকা।

২নং আসামি (সহযোগী): মোঃ সোহেল রানা (২৯), পিতা: আমির হোসেন, স্থায়ী ঠিকানা: মহেশপুর, ঝিনাইদহ; বর্তমান ঠিকানা: বাড্ডা, ঢাকা।

হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আসাদুজ্জামান এজাহারটি গ্রহণ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)-এর ৯(১)/৩০ ধারায় মামলা রুজু করেছেন। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) সুমন মিয়াকে।

ওসি মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। প্রধান আসামিসহ ঘটনার সাথে জড়িতদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপের আড়ালে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে।”

— নিউজ ডেস্ক