জিংক ট্যাবলেট বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। ডায়রিয়া, চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা বা রুচিহীনতায় ডাক্তাররা প্রায়ই এটি লিখে দেন।
কিন্তু সাধারণ জিংক আর জিংক বি-এর পার্থক্য নিয়ে অনেকেরই ধোঁয়াশা আছে। এই লেখায় সহজ ভাষায় সব জানানো হলো।
জিংক ট্যাবলেট কী এবং শরীরে জিংকের প্রয়োজন কেন
জিংক একটি অত্যাবশ্যকীয় খনিজ। শরীর নিজে এটি তৈরি করতে পারে না, তাই খাবার বা সাপ্লিমেন্ট থেকেই নিতে হয়।
জিংক ট্যাবলেটে সাধারণত জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট থাকে, যা বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত ধরন।
শরীরে জিংকের কাজ:
- একশোর বেশি এনজাইমের কাজে সহায়তা করে
- রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল রাখে
- কোষের বৃদ্ধি ও ডিএনএ তৈরিতে ভূমিকা রাখে
- স্বাদ ও ঘ্রাণের অনুভূতি ঠিক রাখে
- শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে
- ইনসুলিন সংরক্ষণ ও নিঃসরণে ভূমিকা রাখে
শরীর জিংক জমিয়ে রাখতে পারে না। তাই প্রতিদিনের খাবারে এর জোগান থাকা জরুরি। ডিম, মাংস, মাছ, ডাল ও বাদামে জিংক পাওয়া যায়। খাবারে ঘাটতি থাকলে বা অসুখে জিংক বেশি বেরিয়ে গেলে ডাক্তার সাপ্লিমেন্ট দেন।
জিংক ট্যাবলেটের উপকারিতা ও কার্যকারিতা
জিংক ট্যাবলেট মূলত জিংকের অভাব এবং যেসব অবস্থায় শরীর থেকে বেশি জিংক বেরিয়ে যায়, সেখানে দেওয়া হয়। যেমন পোড়া, আঘাত, ডায়রিয়া বা প্রোটিন হারানোর রোগ।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে
জিংক শ্বেত রক্তকণিকার কাজ ঠিক রাখে। জিংকের অভাব থাকলে ঘনঘন সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ হতে পারে।
শিশুদের ডায়রিয়ায়
ডায়রিয়ায় ওআরএসের সঙ্গে জিংক দেওয়ার পরামর্শ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা দেয়। এতে ডায়রিয়া কম দিন থাকে এবং আবার হওয়ার ঝুঁকি কমে। সাধারণত ৬ মাসের বেশি বয়সী শিশুকে দিনে ২০ মিলিগ্রাম করে ১০ থেকে ১৪ দিন দেওয়া হয়। ৬ মাসের কম বয়সীদের জন্য মাত্রা ১০ মিলিগ্রাম। শিশুর ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের নির্দেশনা মানুন।
ক্ষত শুকাতে
কোষ বিভাজন ও নতুন টিস্যু তৈরিতে জিংক লাগে। তাই পোড়া বা অস্ত্রোপচারের পর ক্ষত শুকাতে এর ভূমিকা আছে।
ত্বকের সমস্যায়
জিংকের অভাবে ত্বক রুক্ষ হওয়া, ফুসকুড়ি বা ঘা দেরিতে সারার মতো সমস্যা হতে পারে। ব্রণের চিকিৎসায়ও অনেক সময় ডাক্তাররা জিংক দেন।
চুল পড়া রোধে
জিংকের ঘাটতি থাকলে চুল পড়া বাড়তে পারে। ঘাটতি পূরণ হলে উপকার মেলে। তবে ঘাটতি না থাকলে জিংক খেলেই চুল পড়া থেমে যাবে, এমন নয়।
রুচি ও স্বাদ ফেরাতে
জিংকের অভাবে খাবারে অরুচি আসতে পারে। ঘাটতি পূরণ হলে উন্নতি হতে দেখা যায়।

জিংক ও জিংক বি-এর মধ্যে পার্থক্য কী
সাধারণ জিংক ট্যাবলেটে শুধু জিংক থাকে, সাধারণত ২০ মিলিগ্রাম। এর কাজ নির্দিষ্ট, অর্থাৎ জিংকের ঘাটতি পূরণ।
জিংক বি হলো জিংকের সঙ্গে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের মিশ্রণ। উপাদান ও পরিমাণ কোম্পানিভেদে আলাদা হতে পারে। সাধারণত বি১, বি২, বি৬, বি১২, নিয়াসিনামাইড বা ফলিক অ্যাসিড থাকে। প্যাকেটের গায়ে উপাদানের তালিকা দেখে নিন।
ভিটামিন বি যে কারণে যোগ করা হয়:
- খাবার থেকে শক্তি তৈরিতে সাহায্য করে
- স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখে
- রক্ত তৈরিতে সহায়তা করে
- ত্বক, চুল ও মুখের ভেতরের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে
অপুষ্টি বা দীর্ঘ অসুস্থতায় অনেকের জিংক ও বি-ভিটামিন দুটোরই ঘাটতি থাকে। তাই দুটো একসঙ্গে দিতে এই সম্মিলিত ট্যাবলেট তৈরি।
সংক্ষেপে:
- সাধারণ জিংক: শুধু জিংক
- জিংক বি: জিংক ও বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন
কার জন্য কোন জিংক ট্যাবলেট এবং কীভাবে খাবেন
সাধারণ জিংক সাধারণত যাঁদের জন্য:
- ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু
- যাঁদের শুধু জিংকের ঘাটতি ধরা পড়েছে
- পোড়া বা ক্ষত সারানোর সময়, ডাক্তারের পরামর্শে
জিংক বি সাধারণত যাঁদের জন্য:
- যাঁদের খাবারে সার্বিক পুষ্টির ঘাটতি আছে
- দীর্ঘ অসুস্থতার পর শরীর দুর্বল হলে
- মুখে ঘা, ক্লান্তি, চুল পড়া ও ত্বকের সমস্যা একসঙ্গে থাকলে, ডাক্তারের মূল্যায়নের পর
কোনটি আপনার জন্য প্রযোজ্য, তা ডাক্তারই ভালো বলতে পারবেন। নিজে নিজে বেছে নেওয়া ঠিক নয়।
খাওয়ার সঠিক নিয়ম:
- খালি পেটে শোষণ ভালো হয়। তবে অনেকের বমি বমি ভাব হয়। তখন খাবারের সঙ্গে বা পরে খান।
- প্রতিদিন একই সময়ে খাওয়ার চেষ্টা করুন।
- ট্যাবলেট পানির সঙ্গে গিলুন। ডিসপারসিবল হলে এক চামচ পানিতে গুলে নিন।
- টেট্রাসাইক্লিন ও কুইনোলোন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে একসঙ্গে খাবেন না। দুটোর মধ্যে অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ব্যবধান রাখুন।
- আয়রন ও ক্যালসিয়ামের ট্যাবলেটের সঙ্গেও একই সময়ে না খাওয়া ভালো।
বাংলাদেশের বাজারে জিংক ট্যাবলেটের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড
বাংলাদেশে জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট ২০ মিলিগ্রামের কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ড:
- স্কয়ার জিংক (Square Zinc), স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস
- জেসাপ সিরাপ (Zesup), স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস
- জিংক-আর (Zinc-R), র্যাডিয়্যান্ট ফার্মাসিউটিক্যালস
- নিড (Nid), অপসোনিন ফার্মা
- জিংক (Xinc), Eskayef ফার্মাসিউটিক্যালস
জিংক বি-এর ক্ষেত্রে অনেক কোম্পানির নিজস্ব পণ্য আছে।
কেনার সময় ব্র্যান্ডের চেয়ে জেনেরিক নাম ও উপাদানের পরিমাণ মিলিয়ে নেওয়া বেশি জরুরি।
দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই ফার্মেসিতে জেনে নিন।
জিংক ট্যাবলেট বেশি খেলে কী হয়:
সতর্কতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
জিংক উপকারী, তবে বেশি খেলেই বেশি ভালো, এমন ভাবা ভুল।
অতিরিক্ত খেলে যা হতে পারে:
- বমি বমি ভাব ও বমি
- পেটব্যথা, গ্যাস্ট্রিক বা বুক জ্বালা
- ডায়রিয়া
- মাথাব্যথা
- দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় খেলে কপার বা তামার ঘাটতি, যা থেকে রক্তস্বল্পতা ও স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সব উৎস মিলিয়ে দিনে সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা ৪০ মিলিগ্রাম। সাধারণ চাহিদা এর অনেক কম, পুরুষের জন্য প্রায় ১১ মিলিগ্রাম আর নারীর জন্য প্রায় ৮ মিলিগ্রাম। বিস্তারিত জানতে NIH-এর জিংক ফ্যাক্টশিট দেখতে পারেন।

বিশেষ সতর্কতা:
- কিডনির সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না
- গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েরা নিজে থেকে শুরু করবেন না
- শিশুর মাত্রা ওজন ও বয়স অনুযায়ী ডাক্তার ঠিক করবেন
- জিংকে অ্যালার্জি থাকলে খাবেন না
- অন্য ওষুধ চললে ডাক্তারকে জানান
শেষ কথা
জিংক ট্যাবলেট শরীরের জন্য জরুরি, তবে সব সমস্যার সমাধান নয়। শুধু জিংকের ঘাটতি থাকলে সাধারণ জিংক, আর সঙ্গে বি-ভিটামিনের ঘাটতিও থাকলে জিংক বি কাজে আসতে পারে।
কোনটি লাগবে, কত মাত্রায় এবং কতদিন, তা ঠিক করবেন চিকিৎসক। সুষম খাবার খেলে বেশিরভাগ মানুষের আলাদা সাপ্লিমেন্ট লাগে না।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়।
জিংক ট্যাবলেট নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
ডাক্তারের দেওয়া মাত্রা ও মেয়াদ অনুযায়ী খাওয়া যায়। নিজে থেকে দীর্ঘদিন খাওয়া ঠিক নয়।
খালি পেটে শোষণ ভালো হয়। পেটে সমস্যা হলে খাবারের সঙ্গে বা পরে খান।
জিংকের ঘাটতির কারণে চুল পড়লে উপকার হয়। অন্য কারণে চুল পড়লে নাও হতে পারে।
দুটোতেই জিংক থাকে, তাই একসঙ্গে খেলে মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস না করে খাবেন না।











