বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘পর্যবেক্ষক’ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবার গভীর বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে। যে প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম, তা এখন অনেকের মতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে—অসাধু ব্যক্তি, দলীয় নেতাকর্মী, এমনকি অনেক বেনামী ও নামসর্বস্ব পত্রিকা নামধারীরা নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের কার্ড পেয়েছেন; অথচ দীর্ঘদিন নিরপেক্ষভাবে কাজ করা যোগ্য সংস্থা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা কার্ড পাননি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এই ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারা পেলেন কার্ড, কারা বঞ্চিত?
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক অচেনা, অনিবন্ধিত বা কাগুজে অস্তিত্বসম্পন্ন পত্রিকা ও সংস্থা নির্বাচনের সময় হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের কার্ড সংগ্রহে সফল হয়। অভিযোগ রয়েছে—এসব তথাকথিত পত্রিকার কোনো নিয়মিত প্রকাশনা নেই, নেই স্থায়ী কার্যালয় বা দৃশ্যমান কার্যক্রম। তবুও তারা শত শত কার্ড পেয়েছে।
অন্যদিকে, বছরের পর বছর নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যুক্ত অভিজ্ঞ ও স্বীকৃত সংস্থা এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের অনেকে কারিগরি ত্রুটি, কাগজপত্রের অজুহাত বা অস্পষ্ট কারণে বাদ পড়েছেন। যোগ্যদের এই বঞ্চনা এবং অযোগ্যদের প্রাধান্য ইসি’র স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এটি কাদের ব্যর্থতা?
এই বিশৃঙ্খলার প্রধান দায়ভার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ওপরই বর্তায়। বিশ্লেষকরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতার দিক তুলে ধরছেন—
১. যাচাই-বাছাইয়ের চরম ঘাটতি:
আবেদনকারী সংস্থার অতীত কার্যক্রম, আর্থিক উৎস, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের পরিচয় যাচাই করার ক্ষেত্রে ইসি কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যে বিশেষ উইংয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কথা, তারা দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা বা উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে।
২. বেনামী সংস্থা ও পত্রিকার জয়জয়কার:
নির্বাচন এলেই সক্রিয় হওয়া ‘পকেট এনজিও’ ও নামধারী পত্রিকার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে—রাজনৈতিক তদবির বা অর্থের বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে। নির্বাচন শেষে এদের অধিকাংশের আর কোনো কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যায় না।
৩. যোগ্যদের পরিকল্পিত বঞ্চনা:
নিরপেক্ষ ও সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়া অনেক সংস্থাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একটি পক্ষপাতদুষ্ট তালিকা তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
নির্বাচন পর্যবেক্ষকের মূল কাজ হলো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আইনসম্মত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু যখন পর্যবেক্ষকের কার্ড রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিতরণ হয়, তখন পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভোটকেন্দ্রে বৈধ উপস্থিতির সুযোগ:
দলীয় পরিচয়ের কেউ পর্যবেক্ষকের কার্ড পেলে তিনি কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থানের বৈধতা পান। এটি ভোটারদের প্রভাবিত করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন:
নিরপেক্ষ তথ্যের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিবেদন তৈরি হলে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়।
ভোটারের আস্থাহীনতা:
ভোটকেন্দ্রে বিতর্কিত ব্যক্তি বা অচেনা পত্রিকার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ ও অনাস্থা তৈরি করে। এতে ভোটদানে অনীহা বাড়ে এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
আইনি কাঠামো ও ইসি’র দায়বদ্ধতা
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা-২০১৭ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষতা, যোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বেনামী সংস্থা ও পত্রিকাকে কার্ড প্রদান এবং অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ইসি নিজেই নিজের নীতিমালার চেতনা লঙ্ঘন করেছে—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।
আইনজ্ঞদের মতে, যদি প্রমাণিত হয় যে রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মের মাধ্যমে কার্ড বিতরণ হয়েছে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহানির শামিল।
প্রশ্ন এখন একটাই
নির্বাচন পর্যবেক্ষক কার্ড কি তবে স্বচ্ছতার প্রতীক, নাকি রাজনৈতিক ঢাল?
ইসি কি সত্যিই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে চায়, নাকি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না মিললে, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে জনমনে অনাস্থা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা







