জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

আবারও বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন, চার ধরনের তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে নতুন এই দাম।

এতে ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে। আগে এসব তেল বিক্রি হচ্ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকায়। এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম রেকর্ড হলো।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত।

যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি, যার ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

আওয়ামী লীগ আমলে দাম বেড়েছিল ১৪২ শতাংশ

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৪৪ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সায়, অর্থাৎ বৃদ্ধি ঘটে ১৪২ শতাংশ।

একই সময়ে পেট্রোল ও অকটেনের দাম যথাক্রমে ৭৪ ও ৭৭ টাকা থেকে বেড়ে হয় ১২২ ও ১২৭ টাকা, যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

এই সময়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট রাতে, যখন চার ধরনের জ্বালানির দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে ডিজেলের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বেড়েছিল।

২০২৪ সালের মার্চে চালু হয় আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মাসিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওঠানামা করেছে দাম

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশ্ববাজারের সাথে মিলিয়ে কয়েক দফা দাম সমন্বয় করা হয়। সেপ্টেম্বরে অকটেন-পেট্রোলের দাম ৬ টাকা এবং ডিজেল-কেরোসিনের দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা কমে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার ধরনের তেলের দাম ১ টাকা করে বাড়লেও জুনে ডিজেল ২ টাকা এবং পেট্রোল-অকটেন ৩ টাকা করে কমে। ডিসেম্বরে আবার ২ টাকা করে বাড়ে, তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই দফায় ২ টাকা করে কমানো হয়। ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ সমন্বয়ে ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২, পেট্রোল ১১৬ ও অকটেন ১২০ টাকা।

বিএনপি সরকারের সাত মাসে বাড়লো ৩৫-৪৫ টাকা

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় চার ধরনের তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা, যা মার্চ-এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।

এপ্রিলের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বাড়তে থাকায় ১৮ এপ্রিল রাতে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসে। সে সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১১৫, ১৩০, ১৩৫ ও ১৪০ টাকা করা হয়।

জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়, ডিজেল অপরিবর্তিত থাকে। সেই দামই জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত বহাল ছিল। রোববার আবার এক লাফে চার ধরনের তেলের দাম ২০ টাকা করে বাড়লো।

এই হিসাবে গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় বর্তমানে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা। অর্থাৎ বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মাত্র সাত মাসে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত।

আরো পড়ুন- বিদ্যুতের দাম একলাফে গ্রাহক পর্যায়ে ১৬% ও পাইকারিতে ১৯% বাড়লো

লোকসানের কথা বলছে বিপিসি

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার আমদানি ব্যয় চলতি বছরের এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়।

মে মাসের খরচ ৪ হাজার ১৮২ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, আর আগস্টে ২ হাজার ৭৪০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির নিজস্ব তহবিলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকায়, যার মধ্যে এপ্রিলেই লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আমদানি ব্যয় মেটাতে বিপিসি চলতি বছর ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে, বর্তমানে হাতে আছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, অথচ দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের জন্যই প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে সরকারি সহায়তা এবং মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয় বিপিসি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিপিসির অর্থ সংকট নিয়ে গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা, যার ফলে দৈনিক লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাচারের ঝুঁকি এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।

পরিবহন-কৃষি-শিল্পে পড়বে বাড়তি চাপ

নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়বে, ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। ফলে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাবে।

কৃষিতে সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও ধান মাড়াইয়ে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে, পাশাপাশি সার-বীজ পরিবহনের বাড়তি খরচের প্রভাব পড়তে পারে বাজারেও।

শিল্প খাতেও বাড়বে জ্বালানি ব্যয়, বিশেষত যেসব শিল্প গ্যাস সংকটে তরল জ্বালানি ব্যবহার করে, তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের খরচও বাড়বে।

সব মিলিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।