ভুয়া ডাক্তার

একদিনেই মিলছে ‘এমবিবিএস’ সনদ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাসা বেঁধে আছে একটি ভয়ংকর জালিয়াতি চক্র। মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ না পড়েও, এমনকি কোনো বৈধ মেডিকেল কলেজে ভর্তি না হয়েও শুধু টাকার বিনিময়ে হাতে পাওয়া যাচ্ছে ‘এমবিবিএস’ সনদ।

যমুনা টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হাসান মিজবার একটি বিশেষ অনুসন্ধানে এই চক্রের কার্যপদ্ধতি প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে সামনে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, সারাদেশে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ভুয়া পরিচয়ে ‘ডাক্তার’ সেজে প্রতিদিন লাখো রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এই প্রতিবেদনে যমুনা টিভির অনুসন্ধানের তথ্য এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন পর্যালোচনা করে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো, কীভাবে এই জালিয়াতি চলছে, কী শাস্তির বিধান আছে এবং একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কীভাবে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

আরো পড়ুন- মৃত্যুর মোড়ক: বিদেশি ব্র্যান্ডের শিশুখাদ্য থেকে কসমেটিকস ও লাল চিনিতে ভেজালের মহোৎসব

যমুনা টিভির অনুসন্ধানে যা উঠে এলো

যমুনা টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হাসান মিজবা নিজে সরাসরি এই চক্রের কার্যপদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখেছেন। মানবিক বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেবল নিজের নাম, ছবি ও ঠিকানা পাঠিয়ে মাত্র ২২ হাজার ভারতীয় রুপির বিনিময়ে ভারতের কলকাতাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, যার নাম ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল কাউন্সিল’, থেকে একদিনের মধ্যেই এমবিবিএস সনদ সংগ্রহ করেন।

এই সনদের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় অ্যানাটমি, ফিজিওলজিসহ সব বিষয়ে অস্বাভাবিক রকম বেশি নম্বরসংবলিত একটি ভুয়া মার্কশিট এবং একটি অ্যাডমিট কার্ড, যা দেখতে হুবহু আসল মেডিকেল কলেজের নথিপত্রের মতো।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো, ঢাকার একটি চেম্বারে মাত্র ৭০০ টাকা ফি নিয়ে চিকিৎসকের নেমপ্লেট টাঙিয়ে রোগী দেখার মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়, এই ভুয়া সনদ দিয়ে বাংলাদেশে অনায়াসেই যে কেউ নিয়মিত প্রেসক্রিপশন লিখতে পারে, এমনকি সার্জারির পরামর্শও দিতে পারে।

দেশজুড়ে ভুয়া চিকিৎসকদের নেটওয়ার্ক: এলাকাভিত্তিক চিত্র

যমুনা টিভির অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চেম্বারে ভুয়া চিকিৎসকদের নানা ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। নিচের সারণিতে সেসব তথ্য তুলে ধরা হলো।

এলাকাকথিত চিকিৎসকের নামভুয়া ডিগ্রি বা প্রতিষ্ঠানের উৎসপ্রকৃত শিক্ষাগত অবস্থা
বাগেরহাট, শরণখোলামাহমুদুল হাসানঅল্টারনেটিভ মেডিকেল কাউন্সিল, কলকাতাকলেজের নাম তিনবার তিন রকম বলেছেন; বিএমডিসি নম্বর নেই
কুমিল্লা, লাকসামদেলোয়ার হোসেনপ্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, কলকাতাসংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন তিনি কখনোই সেখানে ভর্তি হননি
খুলনাগোলাম মাসুদ মৃধাপ্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিপোশাক কারখানার ওপরে নামসর্বস্ব সাইনবোর্ডধারী প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি
সাভারসাইদুর রহমান (এস আর নজরুল)প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিদাখিল মাদ্রাসা থেকে পাস করে সরাসরি ডিপ্লোমা করার দাবি করেছেন
চাঁদপুরমামুন চৌধুরীপ্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিপ্যারা মেডিকেল বিষয় পড়ে পরবর্তীতে ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার বনে যান

এই তালিকা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ‘প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’ নামের একটি সংস্থা একাধিক জেলায় একই কায়দায় ভুয়া সনদ সরবরাহ করেছে, যা প্রমাণ করে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং একটি সংগঠিত জালিয়াতি নেটওয়ার্ক।

নিজেদের আড়াল করতে তৈরি ভুয়া রেগুলেটরি সংস্থা

শুধু ভুয়া সনদ তৈরি করেই এই চক্র থেমে থাকেনি। নিজেদের আইনি সুরক্ষা দিতে তারা গড়ে তুলেছে একাধিক সমান্তরাল ভুয়া প্রতিষ্ঠান।

আসল বিএমডিসির আদলে ‘বিসিএমডিসি’ নামে একটি ভুয়া সংস্থা খোলা হয়েছে, যা উত্তরার একটি আবাসিক ভবনের ঠিকানা ব্যবহার করছে।

এছাড়া ‘ন্যাশনাল মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন’-এর মতো নামসর্বস্ব প্যাডধারী সংগঠন বানিয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনও করা হয়েছে।

এসব রিটের সুবাদে আদালত থেকে পাওয়া সাময়িক স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে এই চক্র প্রকাশ্যে চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধাগ্রস্ত হয়।

দেখুন যমুনা টিভির প্রতিবেদন-

ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো

বাংলাদেশে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নিজেকে চিকিৎসক দাবি করা বা চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্পূর্ণরূপে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ সংক্রান্ত মূল আইনগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

বিএমডিসি আইন, ২০১০

রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ডাক্তার পদবি ব্যবহার করলে ধারা ২২ ও ২৮ অনুযায়ী সর্বনিম্ন তিন বছর কারাদণ্ড অথবা অন্যূন এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

জাল এমবিবিএস সনদ বা ভুয়া নম্বরপত্র ব্যবহার করলে ধারা ২৯ অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড এবং অন্যূন এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই অপরাধগুলো আমলযোগ্য এবং জামিনঅযোগ্য, অর্থাৎ পুলিশ সরাসরি গ্রেপ্তার করতে পারে এবং সহজে জামিন মেলে না।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০

ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রতারণার জন্য ধারা ৪১৯ অনুযায়ী তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। প্রতারণা করে অর্থ আদায়ের জন্য ধারা ৪২০ অনুযায়ী সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। জাল সনদ তৈরি ও তা ব্যবহারের জন্য ধারা ৪৬৮ ও ৪৭১ অনুযায়ী সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯

ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ভুয়া চিকিৎসকদের ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যায় এবং স্পটেই তাদের চেম্বার বা ক্লিনিক সিলগালা করা সম্ভব হয়। এটি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।

রোগী হিসেবে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন

চিকিৎসাসেবা নেওয়ার আগে কিছু সহজ পদক্ষেপ নিলে ভুয়া ডাক্তারের ফাঁদ এড়ানো সম্ভব।

বিএমডিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট bmdc.org.bd তে গিয়ে ‘Search Registered Doctor’ অপশনে চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর বা পুরো নাম দিয়ে অনুসন্ধান করুন।

সার্চ ফলাফলে চিকিৎসকের ছবি, নাম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা মিলিয়ে দেখুন।

তথ্য সঠিকভাবে না মিললে বা কোনো সন্দেহ হলে সেই চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

চেম্বারে টাঙানো সনদপত্র বা ডিগ্রির নাম গুগলে সার্চ করে যাচাই করে নেওয়াও একটি কার্যকর অভ্যাস।

ভুয়া ডাক্তারের সন্ধান পেলে যেভাবে অভিযোগ জানাবেন

সচেতন নাগরিক হিসেবে ভুয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চারটি কার্যকর মাধ্যম রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কার্যালয়ে, ঠিকানা ৮৬/১ বিজয়নগর ঢাকা, অভিযুক্তের নেমপ্লেট ও প্রেসক্রিপশনের ছবিসহ লিখিত আবেদন জমা দেওয়া যায়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে প্রতারিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ইমেইলে [email protected] ঠিকানায় বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লিখিত প্রমাণসহ অভিযোগ করা যায়।

জরিমানা আদায় হলে অভিযোগকারী তার ২৫ শতাংশ অর্থ পেয়ে থাকেন। নিকটস্থ থানায় সরাসরি গিয়ে ওসির কাছে প্রতারণার ধারা ৪২০ ও বিএমডিসি আইনের অধীনে লিখিত এজাহার দায়ের করা যায়।

এছাড়া জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় বা র‍্যাব ক্যাম্পে তথ্য দিলে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাৎক্ষণিক সাজা নিশ্চিত করতে পারে।

উপসংহার

যমুনা টিভির এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি ভয়ংকর বাস্তবতা সামনে এনেছে।

শুধু আইন থাকলেই হয় না, তার সঠিক প্রয়োগ এবং নাগরিকদের সচেতনতাই পারে এই জালিয়াতি চক্রের বিস্তার রোধ করতে।

প্রতিটি রোগী ও পরিবার যদি চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে এই প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।