বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার

দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর অবশেষে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের (Interpol) রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ প্রধান।

এদিকে জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “অপরাধী যত শক্তিশালী বা যে পদেরই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।”

দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া

স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত বেনজীর আহমেদকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আদালতের ক্রোক আদেশ ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করেছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক ‘এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট’ (অপরাধী প্রত্যর্পণ অনুরোধ) সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যাতে দ্রুত তাঁকে বিশেষ বিমানে ঢাকা আনা যায়।

বেনজীর আহমেদের ‘আলাদিনের চেরাগ’: কী কী অভিযোগ ও সম্পদ মিলেছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ অনুসন্ধান ও আদালতের ক্রোক আদেশের নথিপত্র অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জিশান মীর্জা এবং তিন মেয়ের নামে দেশে-বিদেশে গড়ে তোলা আলাদিনের চেরাগের মতো বিপুল অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. ৬ জেলায় ৩৪৫ বিঘা জমি ও রাজকীয় রিসোর্ট

বেনজীর ও তাঁর পরিবারের নামে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পর্যটন নগরী কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, বান্দরবান ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৩৪৫ বিঘা (১১৪ একর) নিষ্কণ্টক জমির সন্ধান পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে গোপালগঞ্জে শত বিঘার ওপর গড়ে তোলা ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’ সবচেয়ে আলোচিত, যা ক্ষমতার দাপটে তৈরি করা হয়েছিল।

২. গুলশানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ৩৩ ব্যাংক হিসাব

ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের নামে একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে তাঁদের নামে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব (Bank Accounts) এবং ১৯টি কোম্পানির কোটি কোটি টাকার শেয়ারের তথ্য মিলেছে। আদালতের নির্দেশে এই ব্যাংক হিসাবগুলোর শত কোটি টাকা ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ (Freezed) করা হয়েছে।

৩. ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ‘সংখ্যালঘু জমি’ দখল

অনুসন্ধানে বেনজীরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য যে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে, তা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে নিরীহ সংখ্যালঘু (হিন্দু) পরিবারের সদস্যদের পুলিশ ও ডিবির ভয়-ভীতি দেখিয়ে, পিটিয়ে এবং রাতে বাড়ি ঘেরাও করে নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোরপূর্বক জমি বালু দিয়ে ভরাট করে পৈত্রিক ভিটা দখল করা হয়।

৪. বান্দরবানে পাহাড় ও আদিবাসীদের জমি গ্রাস

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে নিজের স্ত্রী ও কন্যাসন্তানদের নামে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২৫ একর পাহাড় লিজ নিয়ে সেখানে বিশাল বাগানবাড়ি, কৃত্রিম পুকুর ও গবাদি পশুর খামার গড়ে তোলেন। এই প্রকল্প করতে গিয়ে স্থানীয় ম্রো ও বম আদিবাসীদের শত বছরের জুম চাষের জমি ও পানির উৎস জবরদখল করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

৫. ব্যক্তিগত লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে পুলিশ ও র‍্যাব ব্যবহার

আইজিপি ও র‍্যাবের ডিজি পদের চরম অপব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত সাভানা রিসোর্ট নির্মাণ, সেখানে রাজকীয় দেখভাল, এমনকি কৃষিকাজ ও পশুপালনের তদারকির জন্য পুলিশের গাড়ি এবং ডিউটিরত পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের ‘বিনামূল্যে’ লাঠিয়াল ও শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করার গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।

৬. বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন

বেনজীর আহমেদের এই অপরাধ কেবল দুর্নীতির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ কর্তৃক ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি হিউম্যান রাইটস স্যাঙ্কশন’-এর আওতায় সাবেক এই আইজিপির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।