বাংলাদেশে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং জ্বালানি সংকট ২০২৬

দেশের জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে সরকারি পর্যায়ে যখন ‘স্বস্তির’ খবর দেওয়া হচ্ছে, তখন রাজপথের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে এক মাসের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে—যা স্বাভাবিক সময়ের ১৫ দিনের মজুতের দ্বিগুণ।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তদারকি এবং মজুত বাড়ানোর এই তৎপরতা কাগজে-কলমে ইতিবাচক মনে হলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে।

মজুত বনাম মাঠপর্যায়ের সংকট

সরকার যখন পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দিচ্ছে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেসব পাম্প কোনোমতে খোলা আছে, সেগুলোতে তেলের জন্য মানুষের হাহাকার চরমে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

২-৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। এই ‘লাইন’ কেবল তেলের জন্য নয়, এটি মূলত আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার এক দৃশ্যমান প্রমাণ। যদি মজুত পর্যাপ্তই থাকে, তবে সাধারণ মানুষকে কেন তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে? কেন পাম্পগুলোতে তেলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে?

আরো পড়ুন- যেকোনো সময় দেশজুড়ে পেট্রোল পাম্প বন্ধের শঙ্কা

ইস্টার্ন রিফাইনারি ও সরবরাহ শঙ্কা

মাঠপর্যায়ের এই সংকটের মূলে রয়েছে দেশের একমাত্র সরকারি শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’র উৎপাদন ঝুঁকি। পরিশোধিত তেলের মজুত থাকলেও অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আছে মাত্র ১২ দিনের।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকা পড়ায় আগামী ১০ দিনের মধ্যে নতুন চালান না এলে রিফাইনারি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যখন মাত্র একটি জাহাজের ওপর ঝুলে থাকে, তখন বুঝতে হবে আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা কতটা নড়বড়ে।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও প্রশ্ন

  • পাম্প বন্ধ কেন? যদি এক মাসের তেল মজুত থাকে, তবে পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না কেন? ডিস্ট্রিবিউশন চেইনে কি কোনো সমস্যা আছে?
  • দীর্ঘ অপেক্ষা: কর্মব্যস্ত দিনে ২-৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কেনা মানে জাতীয় উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের আঘাত। সাধারণ মানুষ কেন এই অব্যবস্থাপনার মাশুল দেবে?
  • অনিশ্চয়তা: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

আমাদের দাবি

সরকারকে কেবল ‘মজুত আছে’ বলে দায় সারলে চলবে না। পাম্পগুলোতে তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া:

  • ডিস্ট্রিবিউশন মনিটরিং: পাম্পগুলোতে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
  • বিকল্প সরবরাহ উৎস: একক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড অয়েল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • জরুরি ব্যবস্থা: ইস্টার্ন রিফাইনারি সচল রাখতে প্রয়োজনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দ্রুত তেলের জাহাজ দেশে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

উপসংহার: জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ। মজুতের পরিসংখ্যান দিয়ে জনমনে স্বস্তি আনা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না পাম্পের লাইন ছোট হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের এই ভোগান্তি নিরসনে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অন্যথায়, এই দীর্ঘ লাইন থেকে সৃষ্ট জনরোষ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।