ভূমিকম্পের ‘ডেথ ট্র্যাপ’

শুক্রবার সকালের ভূমিকম্পটি ছিল প্রকৃতির পক্ষ থেকে আমাদের জন্য আরও একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা।

৫.৭ মাত্রার কম্পনেই যখন রাজধানীবাসী আতঙ্কে দিশাহারা, তখন প্রশ্ন জাগে—রিক্টার স্কেলে মাত্রাটা যদি ৭ বা ৮ হতো, তবে এই শহরের চিত্রটা কেমন হতো? উত্তরটা এতটাই ভয়াবহ যে কল্পনা করতেও গা শিউরে ওঠে।

ঢাকা কেবল একটি শহর নয়, এটি এখন ইট-পাথর, ভ্যান, অটো রিকশার এক বিশাল জঞ্জাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের কারণটি হলো—এই শহরে পালানোর বা আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো ‘সেফ জোন’ বা খোলা জায়গা অবশিষ্ট নেই।

পালানোর পথ নেই: আমরা কি তবে ফাঁদে?

ভূমিকম্পের স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল বলে, “কম্পন অনুভূত হলে খোলা জায়গায় যান।” কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় এই উপদেশটি প্রায় প্রহসনের মতো শোনায়। অলিগলি এত সরু যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না, আর পার্ক বা মাঠগুলো গিলে খেয়েছে বহুতল ভবন। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?

যখন পালানোর পথ থাকে না, তখন নিজেকে দুর্গের ভেতর সুরক্ষিত করাই একমাত্র উপায়। কিন্তু আমাদের সেই ‘দুর্গ’ বা ভবনগুলো কি আদৌ নিরাপদ? রাজউকের জরীপেই দেখা গেছে, ঢাকার অধিকাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড (BNBC) না মেনে তৈরি। যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা এসব ভবনই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ। ভূমিকম্প হোলে কয়েকদিন প্রশাসন নড়া চড়া করে তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষও ভুলে যান ভূমিকম্পের কথা। যে যেভাবে পারবে গাছ কেটে সেখানে দোকান ভাড়া দিবে, না হয় সরু রাস্তায় বাড়িওয়ালা বা মহল্লার রাজনৈতিক নেতারা তার বাড়ীর সামনেই ২/৩ টা ভ্যান বসাবে আর টাকা খাবে।

এখনই যা করণীয়: একটি রোডম্যাপ

বিপদ যখন অনিবার্য, তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। যেহেতু রাতারাতি শহরের কাঠামো বদলানো সম্ভব নয়, তাই আমাদের ‘Damage Control’ বা ক্ষতি কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।

১. কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ:

  • ভবন অডিট (Audit): শহরের প্রতিটি ভবনের ‘স্ট্রাকচারাল ইন্টিগ্রিটি’ বা কাঠামোগত সক্ষমতা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কয়েকদিন পড় ঘুমিয়ে পড়লে হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার (Retrofitting) বা ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • খোলা জায়গা পুনরুদ্ধার: প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা ‘ইমার্জেন্সি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট’ নিশ্চিত করতে হবে, তা যতই ছোট হোক। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে এই উদ্যোগ নিতে হবে
  • গাছ লাগাতে হবে: বাড়ীর আশে পাশে জায়গা খালি রাখতে হবে ও প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এই গাছ।
  • গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন: ভূমিকম্পের পর অগ্নিকাণ্ডই সবচেয়ে বড় ঘাতক হয়ে ওঠে। স্বয়ংক্রিয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রযুক্তি (Auto Shut-off Valve) স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

২. নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রস্তুতি: যেহেতু খোলা জায়গা নেই, তাই দৌড়াদৌড়ি করে সিঁড়িতে ভিড় করা মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে:

  • ‘Drop, Cover, and Hold On’: কম্পন চলাকালীন দৌড়াবেন না। শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন। মাথায় হাত দিয়ে নিজেকে রক্ষা করুন।
  • ইমার্জেন্সি ব্যাগ: প্রতিটি পরিবারে একটি ‘সারভাইভাল কিট’ (শুকনো খাবার, পানি, টর্চ, ফার্স্ট এইড, বাঁশি) প্রস্তুত রাখা উচিত।
  • বাসা বাড়ি নিরাপদ করা: ভারী আসবাবপত্র (আলমারি, শোকেস) দেয়ালের সাথে আটকে রাখুন যাতে কম্পনে গায়ের ওপর না পড়ে।
  • পরিবারের পরিকল্পনা: দুর্যোগের পর পরিবারের সবাই কোথায় মিলিত হবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।

শেষ কথা প্রকৃতিকে আমরা জয় করতে পারব না, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারি। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভূমিকম্প মোকাবিলার চাবিকাঠি হলো—সচেতনতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ।

যত্রতত্র ভবন তৈরির মহোৎসব বন্ধ না হলে, এই শহর একদিন তার বাসিন্দাদের জন্যই এক বিশাল গণকবরে পরিণত হতে পারে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের নড়েচড়ে বসতে হবে।

— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক