বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০১-২০০৬ সাল বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কারণে সব সময় চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
সোমবার (৩ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি যা বলেছেন তার ২য় পর্ব……
সেই ১০০ দিনে ঘটে যাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে।
থানার ওসি নিজের প্রাণ বাঁচাতে জিডি করেছেন:
সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে চট্টগ্রামের রাউজান এলাকা কুখ্যাত হয়ে গিয়েছিল পকিস্থানপন্থী ফকা চৌধুরীর পরিবারের কারণে। তার রাজাকার পুত্ররা রাউজানকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলে। দিনে-দুপুরেও সেখানে রাস্তা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হাঁটতে পারত না ভয়ে, এই বুঝি প্রাণ যায়! রাউজান পৌরসভা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক কর্মীসভায় বিএনপি নেতা সাবেক এমপি রাজাকার গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী (গিকা চৌধুরী) দম্ভের সাথে জানান, রাউজান থানার ভূতপূর্ব ওসি আবুল হোসেনকে হত্যার জন্যে তার মাত্র ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল।
বর্তমান ওসিকেও হত্যার হুমকি দিয়ে গিকা চৌধুরী বলেন, তাকে হত্যার জন্য হয়তো কিছু বেশি খরচ হতে পারে। অবস্থা দেখে নিজের জীবন রক্ষার্থে সেই ওসি থানায় জিডি করেন। যেখানে পুলিশের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নাই, সেখানে সাধারণ মানুষ আর কতটুকু আশা করতে পারে! এমনই ছিল সেসময়কার পরিস্থিতি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কপালে লাগলো কালিমা : ফুটবলের পটল তুলেছেন পটল:
এমনিতে সাফ গেমস-এর বাইরে বাংলাদেশের ফুটবলের নাম শোনা যায় না। তবুও ফিফার সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে একটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অন্তত আছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে সেই সুবাদে। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই বড় রকমের একটি অঘটন ঘটান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল। কোনো রকম পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনা ছাড়াই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বা বাফুফের পুরনো কমিটি ভেঙ দেয়ায় বাংলাদেশকে চরম খেসারত দিতে হয়। ফিফার সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বাংলাদেশকে। শুধুমাত্র প্রতিহিংসার কারণে, আগের সরকারের সময়ে নীতিমালা এবং সকল প্রক্রিয়া অনুসরণে গঠিত কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। নিজেদের লোকজনকে সেখানে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে। ফিফার আইন অমান্য করার কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ফুটবলের আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশের এই বিতাড়িত হওয়াটা জাতি হিসেবে যে কতটা গ্লানি ও লজ্জার, তা ক্রীড়ামন্ত্রী আন্দাজও করতে পারেননি। ক্ষমতায় বসেই তার প্রথম লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ আমলের সকল কর্মকর্তাকে বিতাড়িত করা। দেশের ফুটবলের দখল নেওয়া আর ধান্দা-ফিকিরের রাস্তা সুগম করা। ফিফার সদস্য হিসেবে খেলোয়াড়রা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা বয়ে নিয়ে যেতেন। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা উপলক্ষে বাংলাদেশের নামটা অন্তত উচ্চারিত হতো। সেই নিষেধাজ্ঞার ফলে সব কিছু শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের নাম। নেমে গেল বাংলাদেশের পতাকা। গণমাধ্যমের চাপে মন্ত্রী পটল অনেক অজুহাত দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন সমালোচনার মুখে। কিন্তু দেশবাসীর কথা ছিল একটাই- বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা যিনি উড্ডীন রাখতে পারেননি, তার গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়তে পারে না।
এ বিষয়ে প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ সেসময় লিখেছিলেন, নির্বাচিত জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন কমিটি বাতিল করার দায়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা থেকে বহিষ্কার করছে ফিফা। ফলে সার্ক ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ অনুষ্ঠিত হলো না বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের দোষে। সরকার কোনো কারণই দেখাতে পারলো না এ রকম গাফিলতির। ঘটনাটায় হতাশ হলেন ফুটবল খেলোয়াড়রা, আজ লজ্জা পেল দেশবাসী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এখন এ কথা বলতে পারেন যে, তার সরকার যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ ও মর্যাদা এনে দিয়েছে, সেখানে খালেদার সরকার আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে চরম অপমান।
হাওয়া ভবন নামে মাফিয়া সাম্রাজ্যের তেলেসমাতি শুরু প্রথম দিন থেকেই:
আজ এত বছর পরেও হাওয়া ভবনের সেই লুটপাটের ভার বহন করছে বাংলাদেশ। রাস্তার পাশে একটা পান দোকান দিতে হলেও হাওয়া ভবনের নামে চাঁদা দিতে হতো সেসময়। দেশের মানুষের যে কোনো ব্যবসা, দেশে আসা বিনিয়োগ, বাস-অটোরিক্সা নামানো, কলকারখানা স্থাপন, চাকরি-পদোন্নতি-বদলি থেকে শুরু করে হেন কোনো বিষয় ছিল না, যা সরাসরি হাওয়া ভবনের সাথে সম্পৃক্তদের মধ্যস্থতা ছাড়া হতো। মন্ত্রী-এমপিদের ওপরেও ধার্য করা ছিল চাঁদার নির্দিষ্ট হার। লুটপাটকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করে গড়ে তোলা হয়েছে বিপুল মাফিয়া সাম্রাজ্য।

ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। খালেদা জিয়া ছিলেন নামে মাত্র প্রধানমন্ত্রী, নেপথ্যে থেকে দেশ চালাতেন ‘ক্রাউন প্রিন্স’ তারেক রহমান। মন্ত্রী-এমপি না হয়েও তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। দ্বিতীয় পুত্র আরাফাতও দখল করলেন ক্রিকেট বোর্ড। প্রধানমন্ত্রীর বড় বোন ‘চকলেট আপা’ মন্ত্রীসভার সদস্য। ভাই সাঈদ সাঈদ এস্কান্দারও এমপি হলেন, তার দাপটে কাঁপত বাংলাদেশ বিমানসহ বিভিন্ন খাত। সোনালী ব্যাংকের ১২ কোটি টাকার সুদও মওকুফ করে নিয়েছিলেন এস্কান্দার। খালেদা জিয়ার ভাগ্নে শাহরিন ইসলাম তুহিন এমপি পদে পরাজিত হলেও জায়গা হয় হাওয়া ভবনে। তদবিরের একটা টেবিল ছিল তারও দখলে। খালেদা জিয়ার আত্মীয়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লুটপাটে শামিল ছিলেন বিএনপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দও।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পুত্র মাহী বি. চৌধুরীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাকে এবং অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্রকেও এমপি বানিয়ে আনা হয়। ‘আমরা আর মামুরা’- এই নীতি নিয়ে ক্ষমতায় আরোহণের প্রথম দিন থেকেই চলতে শুরু করে হাওয়া ভবন সাম্রাজ্য আর লুটপাটতন্ত্রের মাফয়া রাজ। তারেক রহমান পরিচালিত হাওয়া ভবনের মাফিয়া সাম্রাজ্যের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ছিল ওপেন সিক্রেট। তাদের সাহস এতটাই বেড়েছিল যে, তারা নিশ্চিত ছিল, কেউ তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। বিরোধীদল এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পরবর্তীতে প্রহিতিংসার শিকার হয়েছিল। গ্রেনেড ছুড়ে তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালায় এই মাফিয়া সর্দাররা।
প্রথম আলো পত্রিকায় হাওয়া ভবন নিয়ে ১৭ই জানুয়ারি, ২০০২ তারিখে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, হওয়া ভবন শুরু থেকে আজ অবধি বহুল আলোচিত। বনানীর সড়ক ১৩/ডি, বাড়ি-৫৩, ঠিকানায় হাওয়া ভবন বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে চালুর গোড়াতেই দলের এক অংশ একে ‘কাশিমবাজার কুঠি’ বলে অভিহিত করেন। এই কার্যালয় সম্পর্কে তারা সন্দিহান ছিলেন। … সরকার গঠনের পর হাওয়া ভবন আবারও আলোচনায় আসে।
অনেকেই বলেন- প্রশাসন মূলত হাওয়া ভবন থেকে পাওয়া নির্দেশেই চলছে। মন্ত্রী, সচিব ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ প্রকাশ্যে আলোচনা করেন, ওই বাড়ি দ্বিতীয় ক্ষমতাকেন্দ্র বা সরকারের ভেতরে সরকার হয়ে উঠছে। … বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে হাওয়া ভবনের কথাই শেষ কথা। সরকারি খাত থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা লাভের জন্য এখানে তদবির চলে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এক আত্মীয়, যিনি গত সংসদ নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের একটি আসনে পরাজিত প্রার্থী, তিনিই অগ্রগামী রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের লোকেরাও হাওয়া ভবনের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করেন। হওয়া ভবন ও তারেক রহমানকে নিয়ে যা কিছু ঘটছে, কিছুরই রাখঢাক নেই, সবই উন্মুক্ত অবস্থায় চলছে।
দেশ কে চালাচ্ছে -মানুষের মধ্যে এই প্রশ্ন জেগে ওঠা কি স্বাভাবিক নয়? খালেদা জিয়ার ডাক নাম ছিল পুতুল। আক্ষরিক অর্থেই তাকে ‘পুতুল’ বানিয়ে রেখেছিল তারেক এবং তার গ্যাং। তবে খালেদা জিয়া ‘পুতুল’ অবস্থাতে থাকলেও তার সায় ছিল পুত্রের যাবতীয় অপকর্মে। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত খালেদা জিয়া পুত্রদের সকল অপকর্মের অন্যতম দোসর। শুধু সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি গদিতে বসতেন, সই করার এখতিয়ারটুকু ছিল তার। বাদ বাকি ক্ষমতা ছিল মাফিয়া সর্দার তারেক রহমানের হাতে।
আরও আসছে ৩য় পর্বে……….
সূত্রঃ সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক পেজ










