জেসমীন আক্তারের “চৈত্রের দহন”

২১শে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরীতে নগ্ন পায়ে আদ্র চোখে যেভাবে শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যেতে,তেমনই ভাবে বিজয় কেতন উড়াতে যুদ্ধ জয়ের উল্লাসে ১৬ই ডিসেম্বরে, তেমনই তুমি বলেছিলে।

আরও বলেছিলে মেলায় যাইরে…
গানের শব্দ বর্ণ শুধু তুমি হারমোনিয়াম, তবলায় তাল লয় তুলোনি,প্রাণের বই মেলায় নাকি অনেকটা সময়ই কেড়ে নিয়েছে।

গল্প,কবিতা, গানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবাধ বিচরণ ছিল তোমার, বলেছিলে তুমি ।
আমি নির্বাক শ্রোতা হয়ে শুনেছিলাম তোমার কথা, তুমি হয়তো দেখেছিলে আমার স্বপ্ন পিপাসু চোখ দুটো কেমন চকমকিয়ে উঠেছিলো।

না না নিরাশ হইনি,তোমার ঘরে পা দিয়েই দেখেছিলাম সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাওয়ার মতো সবধরনের সঙ্গীত যন্ত্র।থরে থরে সাজানো বিভিন্ন ধরনের বই।

নতুন বউ হয়ে যখন এ বাড়ি ও বাড়ি হেঁটে বেড়াই,তখন তোমার সংস্কৃতি প্রেমের ঝাঁপি নিয়ে বসে যেত অনেকেই গল্প করতে, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, আর মনের মধ্যে স্বপ্নের বুনন শুরু হতো।
দিন ক্ষণ মাস গড়ায়,বৈশাখের পর ঘুরেফিরে আসে বসন্ত, স্বপ্নের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে বুননের ফোঁড় হয় এলোমেলো।

ঝাপসা চোখ টানটান করে বাস্তবতা দেখি।
তোমার তখন তেমনভাবে কোনো কিছুই আর টানে না,ছুটির দুপুরে ভাতঘুম না-কি বেশ আয়েশি মনে হয়, তাই বলেছিলে।

একটু ঘুরেফিরে নিজের সাংসারিক ক্লান্তির অবসানের কথা বলাতেই নানান কাজের অজুহাত কিংবা মানিব্যাগের দৈন্যতার কথা ও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছো।

গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসি, কাজের ফাঁকে একটু ছেড়ে নিলে দুএকবার মেনে নিলে ও সময় মতো কটাক্ষ করতে একটু বাঁধেনি তোমার।

সেই তুমি যতক্ষণ ঘরে থাকো,টিভির রিমোট কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে আঙুল চলতেই থাকে, আমি তখন চা এগিয়ে দিচ্ছি।

গল্প পড়া কিংবা লেখার অভিযোগে কতভাবেই ক্ষতবিক্ষত হয়েছি আমি।
এখন আর আমাকে কোনো কিছুই কষ্ট দিতে পারে না।

তুমি কি জানতে কত সকাল তোমার অযাচিত আচরণে বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে আমি অফিস যেতাম, কতটা সময় আমি কারো দিকে তাকাতে পারতাম না,চোখদুটো ভিজে উঠতো,এখন আর তেমন হয় না।

দামী ব্র‍্যান্ডের পারফিউম, সুন্দর কফলিন বোতামে, টাইয়ের নিখুঁত বাঁধনের সময়ের ঘড়িটা ও এগিয়ে দিতাম, কোনো কিছুর কমতি যেন না থাকে ,অথচ সবার সাথে মানিয়ে যখন আমারও বাহ্যিকতায় বৈচিত্র্য আনতে হতো ,সেখানে ও তোমার সমস্যা ছিল।

আগের মতো এখন আর কোনো কিছুতে বিচলিত হইনা,বুক ধড়ফড় করেনা,যেমনটি হতো কোনো ক্ষুদ্র বিষয় কিংবা তোমার কোনো কিছু খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগে রাগ ক্রোধে ফেটে পরা অগ্নিমূর্তি দেখে। অথচ জিনিসটা তোমার চোখের সামনেই ছিল, নয়তো তুমিই অন্য কোথাও রেখেছিলে,ভয়ে আমি এলোমেলো ছোটাছুটি করে খেঁই হারিয়ে ফেলতাম।

দিব্যি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পরি,মনে পরে তোমার সারাদিনের ছুটাছুটি করে কাজ শেষে একটু বিশ্রাম এর আশায় যেই বসেছি, তখনই দিনশেষের খুচরো হিসেবের খাতা মেলে আমাকে হাঁপিয়ে তুলতে! অভিমানে, রাগে না খেয়ে কতো রাতকে ভোর করেছি,তুমি অঘোরে ঘুমিয়েছো।

এখন আর দুদন্ড শান্তির আশায় তোমার মুখ চেয়ে বসে থাকতে হয় না আমার। আমার আমিত্বটাকে ভালো রাখার নৈপুণ্যতা ঠিকঠাক আয়ত্ত করে নিয়েছি।

জোছনা আমাকে এখন আর তেমন ভাবায় না,ঘোর অমানিশায় আমি ক্যানভাসে রঙ তুলতে পারি,যেমনটি আকৃষ্ট হইনা নদীর কলকল মুখরতায় তারচে অনেক বেশি টানে সমুদ্রের গর্জন।
ফাল্গুনের মৃদুমন্দ বাতাসের চেয়ে ঢেরবেশি উপভোগ করি বৈশাখী ঝরো হাওয়া।

তুমি এখন সময় চাও আমার কাছে, নিভৃতে কিছু মৌন কথার অনুভূতি কেমন হয় সেই সুখটা ও ছুঁয়ে নিতে চাও ,মুখোমুখি বসে চায়ের কাপের ধোঁয়ার উষ্ণতা উপভোগ করতে ও নাকি খুব ইচ্ছে জাগে,শুনে হাসি!
কিন্তু আমার অত সময় কই,নিজেকে আটকে নিয়েছি ব্যস্ততার কাঁটাতারে, অনেকটা স্ব ইচ্ছেয়,খুব উপভোগ করি তোমার একাকিত্বকে!

জানো এখন আমার বৃষ্টি ভালো লাগেনা, কেমন ভেজা স্যাঁতসেঁতে, কেবলই মনে হয় আকাশটা কাঁদছে।
ভালো লাগে সোনাঝরা রোদ,কেমন চকচকে, ঝলমলে।

নিজের ভেতর চৈত্রের দহন নিয়ে আমি আমরা নারী জাতি স্নিগ্ধ সতেজতায় ভরা দু’ চোখ মেলে স্বপ্ন দেখি,স্বপ্ন সাজাই, রাঙাই।

লেখক- জেসমীন আক্তার