Home গদ্য-পদ্য জেসমীন আক্তারের লেখা -“ শবেবরাত কথন “

জেসমীন আক্তারের লেখা -“ শবেবরাত কথন “

186
0
জেসমীন আক্তার

মসজিদের দরজা থেকে শুরু করে অনেক দূর অবধি রাস্তার দুই পাশে পসরা সাজিয়ে বসেছে কিশোর, যুবক নানা শ্রেণির মানুষ।

যেন এক রাতের ব্যবসা করেই ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লেখাবে এমন একটা অবস্থা।
ক্রেতা হিসেবে ঘুরছে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, কারো মাথায় টুপি, কারো গায়ে নতুন জামা, এদের মধ্যে ছুঁই ছুঁই যুবকের আনাগোনা ও কম ছিল না।
নানা রকমের মশলা মিশ্রিত ঝালমুড়ি, কোনোটাতে বিভিন্ন রকমের হালুয়া, কোনোটার বিভিন্ন ডিজাইনের কারুকাজ করা রুটি যেগুলোতে মতি পুতি ও আয়না বসানো থাকতো।
কোনোটায় আগরবাতি, মোমবাতি ও তারাবাতি শোভা পেত।
কী অসাধারণ আমেজ নিয়ে শবেবরাত এর সন্ধ্যাটি শুরু হতো।

এর প্রায় দুই দিন আগে থেকেই বাড়ির মহিলাদের ঘরের ঝুলঝাড়া থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকতে হতো কারণ একটাই, ঘরে নয়তো ফেরেশতা আসবেন না।

দিনের শুরুতেই যথানিয়মে রান্নার পাশাপাশি নিজ হাতে বানানো রুটি বিভিন্ন রকমের হালুয়া বানিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি পাঠানোটাকে ও অনেকটা দায়িত্বই মনে করা হতো।
সন্ধ্যা হলেই বাড়ির পুরুষরা পরিস্কার পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি দিয়ে,আতর লাগিয়ে বেরিয়ে পরতেন।
বাড়ির মা খালারা ও ইবাদতে মশগুল থেকেছেন।
পাড়ার কিশোররা দিন কয়েক আগে থেকেই কোথা থেকে কোন ভুড়ির চামড়া যোগাড় করে,প্রসেসিং করে সেটার ভেতর কি এক ধরনের বারুদ মিশিয়ে “মোররা” নামের আতশবাজি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতো, কতটা উদ্যোমী হয়ে কাজটি করতো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

জেসমীন আক্তার-লেখক

এটার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলে তিড়িং বিড়িং করে কোথায় যে গিয়ে পরতো,তার হিসেব কে রাখতে পেরেছে!
কত মানুষের নতুন জামা পুড়েছে, কারো লুঙ্গি, কারো হাত পায়ে ঠোসা ,কারো শাড়ি বাঁচানোর জন্য জোরে ছোটা।
আমরা ছোটোরা কম যাই কি করে,
বড়দের এসব কাজে সহযোগিতা করা,মায়ের বানানো খাবার বিলানো সহ ঘরে মোমবাতি, আগরবাতি জ্বালানোর কাজটি করেছি অতি উৎসাহের সাথে।
অবশ্য আমার জামাটি ছিদ্র হওয়ার পর থেকে মোররা আমি দু’চোখে দেখতে পারতাম না, দেখলেই দৌড়াতাম।

আগরবাতির মৌ মৌ গন্ধে ও ঘরে মন টিকতো না। কনডেন্স মিল্ক কিংবা তার চেয়ে ও বড় সাইজের ডিব্বা, বড় ভাইদের সহযোগিতায় ফুটো করে হ্যাজাক বানিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম, চারিদিকে বিজলির আলোয় সয়লাব থাকার পরে ও। কী একটা অবস্থা!
একটু যখন বড় হলাম মরিচা বাতি আর তারাবাতিকে কেমন খেলনা মনে হতো।
মায়ের ন্যাপথালিন মোড়ানো, যার ভাঁজে ভাঁজে সুগন্ধি ছড়াতো,এমনই নতুন শাড়ি বের করে পরে সেই সন্ধ্যা থেকে ওযু করে বসতাম জায়নামাজে।
সাথে থাকতো হাদিসের বই,কোন ইবাদত করলে কত সওয়াব হবে তার হিসেব ও থাকতো কড়ায়গণ্ডায়।

আরো বড় হলে শাড়ি বাদ দিয়ে নতুন জামা,মনে হতো যেন ঈদ। আর ভাবতাম আল্লাহ আমাকে দেখে কতই না খুশি হবেন, আমি তাঁর ইবাদতের জন্য কত পরিপাটি হয়ে বসেছি।
ফ্লাস্ক ভর্তি চা,মাঝে মধ্যে এক আধটু গল্প করা,বন্ধুদের সাথে রাত দুপুরে মুড়িমাখা খেয়ে ঘুম তাড়ানোর কি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা!

আগরবাতির সৌরভ মেশানো ঘরে, মসজিদ থেকে মাইকের মাধ্যমে ইমামের ভরাট গলার খুতবার নৈসর্গিক আওয়াজে বিভোর হয়ে থাকতাম।
রাত যত শেষের দিকে, ততই আফসোস এর দীর্ঘশ্বাসটি ভারী হতে থাকতো, ভাবতাম এইতো শেষ হয়ে যাবে বরকতময় রাতটি,আগামীতে পাবো তো!
ভুলতাম না কত রাকাআত নামাজ পড়তাম, অনেকটা প্রতিযোগিতার মতো হতো কে কার চেয়ে বেশি পড়তে পারে,কুরআন খতমে ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিলাম।তসবিহ পড়া,জিকির সবই হতো বড়দের দেখে দেখে।
ভাবতাম যত ইবাদত তত বরকত।

ফজরের নামাজ শেষে যে যার মতো করে মোনাজাতে কত রকমের আকুতি, চাওয়া থাকতো!
কতটা নিয়ম আর অনিয়মের মধ্যে সে সময়টি গিয়েছে, সেই হিসেব আমি করি না।শুধু ভাবি ভক্তিতেই শক্তি ।
সেই সময়ের ভাবগাম্ভীর্যের সাথে যে শবেবরাত পালন হতো,সেখানে ছিল ভক্তি, শ্রদ্ধা, আল্লাহর ভয়।
ইট পাথরের শহরে এ রাতে আমি আশেপাশের বিল্ডিং গুলোতেই দেখি,যার বেশির ভাগই লাইট অফ, ঘুমন্ত শহর।
অনেক বাচ্চা হয়তো জানেই না এর ফজিলত।

যেমনটা আমরা বসে থাকতাম ফজর অব্দি দরজা খোলা রেখে,ফেরেশতা বরকত নিয়ে আসবেন হয়তো,হয়তো ভাগ্যের খাতায় আরও ভালো কিছু লেখা হবে,ভাবনায় এমনই থাকতো।
মন্দ তো ছিল না, নয়তো কিছু আনুষ্ঠানিকতাই হতো! সেই সুবাদে গরীব মিসকিন কিছু ভালো খাবার পেত,মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি বজায় থাকতো।

ধর্মীয় ভাবে না দেখে সামাজিক ভাবে দেখলেই বা ক্ষতি কি!
এমন এই মহিমান্বিত রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি নিজের সহ আল্লাহর সকল বান্দার জন্য।
সবার জীবন রহমতময়,বরকতময় হউক।
করোনা সহ সকল রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।
আমিন।

লেখক- জেসমীন আক্তার