আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী।
(১৯ জানুয়ারি ২০২৬ )
জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১): বাংলাদেশের এক অমর নাম, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, বীর সেনানায়ক, রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা।
শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল সাহস, দূরদর্শিতা এবং জাতীয়তাবাদের এক অনন্য অধ্যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনী বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
এই বিস্তারিত জীবনচরিতে শহীদ জিয়াউর রহমানের শৈশব থেকে শহীদ হওয়া পর্যন্ত সবকিছু স্থান পেয়েছে।
শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রারম্ভিক জীবন ও পরিবার
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে (মণ্ডল বাড়ী) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ, যিনি কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ সরকারি দপ্তরে কাগজ ও কালির রসায়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাতা জাহানারা খাতুন (রানী) ছিলেন গৃহিণী এবং গানপ্রিয়। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘কমল’।
শৈশবের একাংশ কেটেছে বগুড়ার গ্রামীণ পরিবেশে এবং কলকাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমা হামলার ভয়ে পরিবার গ্রামে চলে আসে। জিয়াউর রহমানের শিক্ষা শুরু হয় বগুড়া শহরের একটি স্কুলে। পরে তিনি কলকাতার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়েন। ১৯৫৩ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করেন।
আরো পড়ুন- খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে ‘দেশনেত্রী’
শহীদ জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবনের শুরু
কমিশনের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হন। ১৯৫৯-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে (ISI) দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকরান সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৯ সালে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হন। পশ্চিম জার্মানিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৭০ সালে মেজর পদে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করলে বাঙালিরা প্রতিরোধে নামে। মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দেন। ২৬ মার্চ রাতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণাপত্রে বলেন:
“আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করছি যে, বাংলাদেশ স্বাধীন।”
এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি সেক্টর ১-এর অধিনায়ক হন, পরে ‘জেড ফোর্স’ গঠন করেন। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, রামগড় প্রভৃতি এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁর বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করে।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় ও সেনাপ্রধান
১৯৭১-এর ডিসেম্বরে স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান লে. কর্নেল থেকে কর্নেল, পরে ব্রিগেডিয়ার ও মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭২ সালে ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ, ১৯৭৫ সালে চিফ অব আর্মি স্টাফ হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশে অস্থিরতা দেখা দেয়। খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারে জিয়াউর রহমান চিফ অব আর্মি স্টাফ হন। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে তিনি গৃহবন্দী হন। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবে তিনি মুক্ত হন এবং চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হন।
রাষ্ট্রপতিত্ব (১৯৭৭-১৯৮১)
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৮ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন।
তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, প্রেস ফ্রিডম ফিরে আসে, বাজার অর্থনীতি চালু হয়। তিনি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ যোগ করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন, যা ভাষা-সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে:
- গ্রামীণ সেচ ও খাদ্য উৎপাদন কর্মসূচি
- গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা
- যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়
- বহির্বিশ্বে শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি (রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভিত্তি)
বৈদেশিক নীতিতে:
- SAARC-এর ধারণা প্রস্তাব (১৯৮৫-এ প্রতিষ্ঠিত)
- মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার
- মধ্যপ্রাচ্য, চীন, যুক্তরাষ্ট্র সফর
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৬০ সালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই পুত্র: তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। জিয়াউর রহমান ছিলেন পরিবারপ্রিয়, সৎ ও সাদাসিধে জীবনযাপনকারী।
শাহাদাত
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী অফিসারের হাতে তিনি নিহত হন। তাঁর শাহাদাতে দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের নায়ক, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। তাঁর নামে বিমানবন্দর, মেডিকেল কলেজ, হল প্রভৃতি নামকরণ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের জীবন থেকে শিক্ষা: সাহস, দূরদর্শিতা ও জাতির প্রতি নিষ্ঠা। তিনি বলতেন, “বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার জীবনের লক্ষ্য।”





