বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব নাম গভীরভাবে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৮১ সালের মে মাসে বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় খালেদা জিয়া ছিলেন সম্পূর্ণ রাজনীতিবিমুখ এক গৃহবধূ।
রাজনীতির মঞ্চে সক্রিয় অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না।
কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতা, জাতির প্রয়োজনে দায়িত্ব গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীদের একজন।
দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব এবং ইতিহাসে স্থান পাওয়া মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
জন্ম, পরিবার ও শিক্ষাজীবন
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে। তার পৈতৃক নিবাস ফেনীর পরশুরামে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে তার ডাক নাম ছিল ‘পুতুল’।
ব্যবসার প্রয়োজনে তার বাবা দেশভাগের পর দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কাটে। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন শান্ত ও সংযত স্বভাবের।
খালেদা জিয়া- বিয়ে ও পারিবারিক জীবন
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদা জিয়ার বাবার বাড়িতে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সে সময় জিয়াউর রহমান দিনাজপুর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে দুই পরিবারের মধ্যে পূর্বপরিচয় থাকায় এই বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এই দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করেন—
- তারেক রহমান (জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৬৫)
- আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম: ১২ আগস্ট ১৯৭০)
রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হয়েও খালেদা জিয়া কখনো সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি। ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে প্রটোকলগত দায়িত্ব পালন করলেও তিনি নিজেকে সবসময় গৃহিণী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন।
বিধবা জীবন ও রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা।
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
একদিকে স্বামী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নেতৃত্বশূন্য বিএনপি—এই সংকটময় মুহূর্তে দলীয় নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া।
জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি হিসেবে আত্মপ্রকাশ
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার বয়স ও অসুস্থতার কারণে দলকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন।
অন্যদিকে, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভেতরে এমন একজন নেতার প্রয়োজন দেখা দেয়, যিনি
- দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন
- জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করবেন
- স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেবেন
এই তিনটি শর্তেই খালেদা জিয়া ছিলেন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মুখ।
বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন।
অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এই সময় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ও দমন-পীড়নের শিকার। খালেদা জিয়া দৃঢ় হাতে দলকে সংগঠিত করেন এবং ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু করেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’
১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বছর চলতে থাকে। বহুবার গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা ও দমন-পীড়নের মুখেও তিনি রাজপথ ছাড়েননি।
১৯৮৭ সালে ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন।
এই দীর্ঘ আন্দোলনে কোনো আপস না করায় খালেদা জিয়া পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম নারী সরকারপ্রধান।
পরবর্তীতে তিনি
- ১৯৯৬ (স্বল্প সময়)
- ২০০১–২০০৬
মেয়াদে আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খালেদা জিয়ার নির্বাচনে রেকর্ড ও জনপ্রিয়তা
খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে ২৩টির বেশি আসন থেকে নির্বাচন করেছেন এবং কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল রেকর্ড।
তিনি বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনা থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন।
‘এক-এগারো’ ও রাজনৈতিক নিপীড়ন
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে তার সরকার পতন ঘটে। তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এক বছর কারাবন্দি রাখা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৫ সালেও তাকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ‘দেশনেত্রী’ উপাধি
খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত নেতা।
- ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় একাধিকবার স্থান দেয়
- ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সিনেটে তাকে “Fighter for Democracy” হিসেবে সম্মানিত করা হয়
দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে তিনি পরিচিত ‘দেশনেত্রী’ নামে।
উপসংহার
গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক—খালেদা জিয়ার জীবন কেবল একজন রাজনীতিবিদের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
নির্যাতন, নিঃসঙ্গতা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আপসহীন থেকেছেন গণতন্ত্রের প্রশ্নে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়—যার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে।
–নিউজ ডেস্ক/ইনিউজআপ















