পুলিশ জানিয়েছে, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার মূল কারণ ছিল নেশা করতে বাধা দেওয়া। এ ঘটনায় আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
মূল ঘটনা ও পুলিশের বক্তব্য
রোববার দুপুরে রংপুর কোতোয়ালি থানায় সংবাদ সম্মেলনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এ তথ্য জানান।
আটক দুজন হলেন – মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা একই এলাকার (মাছুয়াপাড়া) বাসিন্দা এবং সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। পুলিশ তাদের চিহ্নিত মাদকসেবী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কীভাবে ঘটনাটি ঘটে?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী:
- শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন করছিলেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ।
- বিষয়টি টের পেয়ে গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের নেশা করতে নিষেধ করেন।
- এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
- একপর্যায়ে ওই দুজন শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তাঁকে ও পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন।
- পরে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে চলে যায় বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
ওসি নাজমুল কাদের বলেন, আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে।
মরদেহ উদ্ধারের বিবরণ
শনিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
- আয়ুশ চক্রবর্তী (১২/১৪): প্রথম তলার শোবার ঘরের খাটের ফাঁকে, গলায় কাপড় পেঁচানো।
- প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ও আগামী চক্রবর্তী (২৫/২৮): তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে, গলায় দড়ি পেঁচানো।
- গণপতি চক্রবর্তী (৬৫): তৃতীয় তলার ছাদে, গলায় গামছা পেঁচানো।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শ্বাসরোধ করে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মুখ কিছুটা ঝলসানো অবস্থায় ছিল বলে সিআইডি জানিয়েছে; মুখে রাসায়নিক জাতীয় কোনো পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডাকাতি না পরিকল্পিত হত্যা?
রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, হত্যাকারীরা ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চারজনকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কিনা, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, ভবনের তিনটি কক্ষের আলমারি ও ড্রয়ার খোলা ছিল, কাপড়চোপড় ও জিনিসপত্র ছড়ানো ছিল। তবে কোনো আলমারি বা ড্রয়ার ভাঙা হয়নি; চাবি দিয়েই সেগুলো খোলা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ঘরে থাকা টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোন নেয়নি দুর্বৃত্তরা।
স্বজনদের বক্তব্য ও সময়রেখা
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান:
- বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটে বড় বোন প্রীতিলতা ও ভাগনি আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর কথা হয় (প্রায় ৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড)।
- রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে তার কাছে একটি কল আসে, কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে থাকায় ধরতে পারেননি।
- শুক্রবার বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাননি।
- বিকেলের পর সব কটি ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে সন্দেহ হয়।
- রাত পৌনে ৯টার দিকে তিনি নগরের ফায়ার সার্ভিস এলাকার বাসা থেকে বোনের বাড়িতে যান।
- বাড়ির মূল ফটকে তালা দেখে কলিং বেল চাপেন, ভেতর থেকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় পাশের ভবনের দিক দিয়ে জানালার কাছে যান।
- থাই গ্লাসের লক ভেঙে ভেতরে আলো ফেললে একটি ঘরের জিনিসপত্র তছনছ অবস্থায় দেখতে পান।
- পরে পুলিশকে খবর দেন।
নিহতদের পরিচয়
- গণপতি চক্রবর্তী (৬৫): রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
- প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০): গণপতির স্ত্রী।
- আগামী চক্রবর্তী (২৫/২৮): রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর।
- আয়ুশ চক্রবর্তী (১২/১৪): রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
মামলা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
এ ঘটনায় মামলা ডিটেক্ট হয়েছে এবং আটক দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ হত্যার প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।













