Home নাগরিক দুর্ভোগ ভেজাল খাদ্য কেলেঙ্কারি: নেসলে, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি...

ভেজাল খাদ্য কেলেঙ্কারি: নেসলে, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নিরাপদ খাদ্য আইনের কঠোর প্রয়োগ: নিম্নমানের কিটক্যাট, ভেজাল চিনি ও গুঁড়া দুধ বাজারজাতের অভিযোগে দেশের শীর্ষ তিন কর্পোরেট সংস্থার প্রধানদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।

265
0
ভেজাল খাদ্য কেলেঙ্কারি: নেসলে, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের

ভোক্তাদের আস্থায় চরম আঘাত! নিম্নমানের কিটক্যাট চকলেট, ভেজাল ও অনিরাপদ চিনি এবং মানহীন গুঁড়া দুধ বাজারজাতের গুরুতর অভিযোগে দেশের তিন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এখন আইনের জালে।

এক নজিরবিহীন রায়ে নেসলে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাব রিপোর্টে নেসলের তিন পণ্যের ভয়াবহ মানহীনতা প্রমাণিত হওয়ার পর আদালতের এই কঠোর পদক্ষেপ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কর্পোরেট সততা নিয়ে বিশাল প্রশ্ন তুলেছে, যা বাজারজুড়ে সৃষ্টি করেছে তীব্র তোলপাড়।

একই সঙ্গে, ভয়াবহ ভেজাল ও অনিরাপদ চিনি সরবরাহের গুরুতর অভিযোগে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল এবং নিম্নমানের গুঁড়া দুধ বিক্রির দায়ে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন আলম-এর বিরুদ্ধেও এই কঠোর আদেশ দিয়েছে আদালত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (২৪ নভেম্বর) বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি এই যুগান্তকারী পরোয়ানা জারি করেন।

ল্যাব রিপোর্টে প্রমাণিত ভয়াবহ জালিয়াতি

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাব রিপোর্টে তিন পণ্যের ক্ষেত্রেই ভোক্তাদের সঙ্গে নজিরবিহীন প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে:

  • নেসলে কিটক্যাট: চকলেটে দুধের কঠিন অংশ (মিল্ক সলিড) থাকার কথা ন্যূনতম ১২%, কিন্তু পরীক্ষায় পাওয়া গেছে মাত্র ৯.৩১%। দুগ্ধ চর্বির মাত্রা ন্যূনতম ২.৫% থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ১.২৩%। আমদানি নীতি লঙ্ঘন করে বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়াই কিটক্যাট বাজারজাতের অভিযোগও উঠেছে।
  • এসএ গ্রুপের গুঁড়া দুধ (‘গোয়ালিনী’): পণ্যে ‘ফুল ক্রিম’ দাবি করা হলেও এটি মানহীনতার চরম নজির স্থাপন করেছে। যেখানে প্রোটিন ৩৪% থাকার কথা, সেখানে পাওয়া গেছে এক-চতুর্থাংশের কম, মাত্র ৯.৫%! দুগ্ধ চর্বির মান ৪২% থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৭.৫৮%
  • মেঘনা গ্রুপের ‘ফ্রেশ রিফাইন সুগার’: ল্যাব পরীক্ষায় এই চিনিকে ‘ভেজাল ও অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।
ভেজাল খাদ্য কেলেঙ্কারি: নেসলে, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের
ছবিঃ সংগৃহীত

মামলাকারীর দৃঢ় অবস্থান: নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসান জানান, “পরিদর্শনে যেসব পণ্যে সন্দেহ হয়েছে, আমরা তা ল্যাবে পাঠিয়েছি। কিটক্যাট ও ফ্রেশ রিফাইন সুগার পরীক্ষায় ভেজাল ও নিম্নমান ধরা পড়েছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর ভিত্তিতেই আদালত কঠোর আদেশ দিয়েছেন।”

কর্পোরেট প্রতিক্রিয়া: ‘হয়রানি’ বনাম ‘ভুয়া’ দাবি

আদালতের এই কঠোর পদক্ষেপের মুখে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো নিজেদের নির্দোষ দাবি করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে:

  • নেসলে বাংলাদেশ: কোম্পানির পক্ষ থেকে এটিকে ‘হয়রানি ছাড়া কিছু নয়’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তারা দাবি করছে, কিটক্যাট পরীক্ষার জন্য এখনো বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়নি এবং মামলাকারী আদালতকে ভুলভাবে প্রভাবিত করেছেন।
  • মেঘনা গ্রুপ: মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (ব্র্যান্ড) এই মামলা এবং অভিযোগকে সরাসরি ‘ভুয়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভেজাল ও মানহীন খাদ্যপণ্য বন্ধে প্রতিমাসে প্রায় ১৫০টি স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয় এবং কোনো পণ্য ভেজাল পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

দুই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ১৫ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

— নিউজ ডেস্ক