দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে ‘লেডি সুপারস্টার’ নামে পরিচিত নয়নতারার প্রকৃত নাম ডায়ানা মারিয়াম কুরিয়েন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৪ সালের ১৮ নভেম্বর, কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে, একটি সিরিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে।
বাবা ছিলেন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, তাই ছোটবেলা কেটেছে ভারতের বিভিন্ন শহরে। কেরালার তিরুভাল্লায় স্কুলজীবন শেষে মার থোমা কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি নেন তিনি।
অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু প্রথম সিনেমাতেই সুযোগ পাওয়ায় সেই পথ বদলে ফেলেন।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মালয়ালম, তামিল ও তেলুগু সিনেমায় সক্রিয় থেকে নয়নতারা প্রমাণ করেছেন কীভাবে প্রতিভা আর অধ্যবসায়ের জোরে একজন অভিনেত্রী পুরুষ-নির্ভর ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত ধারা ভেঙে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন।
২০১৮ সালে তিনিই একমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি ফোর্বস ইন্ডিয়ার ‘সেলিব্রিটি ১০০’ তালিকায় জায়গা পেয়েছিলেন।

অভিষেক ও প্রাথমিক সাফল্য
নয়নতারার চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় ২০০৩ সালে মালয়ালম সিনেমা ‘মানসিনাক্কারে’ দিয়ে, যা বক্স অফিসে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এই সিনেমার সাফল্যের পরই তিনি নিজের আসল নাম ছেড়ে গ্রহণ করেন ‘নয়নতারা’ নামটি, যার অর্থ ‘চোখের তারা’।
পরবর্তীতে ২০১১ সালে তিনি এই নামটিকেই আইনগতভাবে নিজের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেন এবং হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হন।
মালয়ালম সিনেমায় পরিচিতি পাওয়ার পর খুব দ্রুতই তিনি তামিল ও তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নেন। ২০০৫ সালে তামিল সিনেমা ‘আইয়া’ দিয়ে তামিল অভিষেক এবং ২০০৬ সালে ‘লক্ষ্মী’ সিনেমা দিয়ে তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করেন।
এরপর কিংবদন্তি অভিনেতা রজনীকান্তের বিপরীতে ‘চন্দ্রমুখী’ (২০০৫) এবং ক্রিস্টোফার নোলানের ‘মেমেন্টো’-র তামিল রিমেক ‘ঘাজনি’ (২০০৫) সিনেমা দুটি তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে অভিষেক হওয়া নয়নতারা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নিজের চেয়ে বহু বছরের বড় প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদের বিপরীতে কাজ করেছেন, যা তাকে দ্রুত ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

নায়ককেন্দ্রিক ইন্ডাস্ট্রি ভেঙে ‘লেডি সুপারস্টার’ খেতাব
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা চিরাচরিতভাবে নায়ককেন্দ্রিক। কিন্তু নয়নতারা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এমন সব সিনেমায় অভিনয় করেন, যেখানে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি নিজেই, কোনো বড় পুরুষ তারকার উপস্থিতি ছাড়াই।
‘মায়া’ এবং ‘কোলামাভু কোকিলা’র (কোকো নামেও পরিচিত) মতো সিনেমাগুলো একক নায়িকা-নির্ভর প্রজেক্ট হয়েও বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায়, যা সে সময়ের তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় অভাবনীয় একটি ঘটনা ছিল।
এই ধারাবাহিক সাফল্যই তাকে এনে দেয় ‘লেডি সুপারস্টার’ খেতাব, একটি উপাধি যা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এর আগে কোনো নারী অভিনেত্রীর নামের সঙ্গে এত ব্যাপকভাবে জড়িয়ে যায়নি।
প্রযোজকরা বুঝতে শুরু করেন, দর্শক শুধু নায়ক দেখতে নয়, নয়নতারাকে দেখতেও প্রেক্ষাগৃহে যান, এই উপলব্ধি ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসায়িক সমীকরণকেই বদলে দেয়।

বিতর্ক, বিরতি ও মহাবিক্রমে ফেরা
নয়নতারার ব্যক্তিগত জীবনও বহুবার আলোচনায় এসেছে গণমাধ্যমে। পরিচালক প্রভুদেবার সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং তাদের বিচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘদিন গুঞ্জন চলেছিল দক্ষিণ ভারতীয় মিডিয়ায়।
এই সম্পর্কের টানাপোড়েন তার ক্যারিয়ারেও প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেকে মনে করেন। এছাড়াও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও নানা জল্পনার মুখে পড়েছেন তিনি।
তবে প্রতিটি চ্যালেঞ্জিং পর্বের পরই নয়নতারা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের অস্থিরতা কাটিয়ে তিনি নিজের পেশাগত জীবনে মনোযোগ ধরে রেখেছেন এবং একের পর এক বাণিজ্যিকভাবে সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন।
আরো পড়ুন- বাস ড্রাইভারের ছেলে থেকে ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সুপারস্টার
বিরতি কাটিয়ে শীর্ষে ফিরে আসার এই ক্ষমতাই তাকে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী তারকায় পরিণত করেছে, যেখানে অনেক সমসাময়িক তারকাই সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে গেছেন।

বলিউডে পদার্পণ ও বৈশ্বিক পরিচিতি
দুই দশকেরও বেশি সময় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় রাজত্ব করার পর নয়নতারা ২০২৩ সালে হিন্দি সিনেমা ‘জওয়ান’ দিয়ে বলিউডে অভিষেক ঘটান। শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করা এই সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে বিশাল সাফল্য পায় এবং তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমায় পরিণত হয়।
‘জওয়ান’-এর মাধ্যমে নয়নতারা শুধু হিন্দি সিনেমার দর্শকদের কাছেই পরিচিত হননি, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার নাম আলোচিত হতে শুরু করে।
এই সিনেমার সাফল্যের পর নয়নতারা প্রমাণ করেন যে, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি নিয়েও একজন অভিনেত্রী হিন্দি সিনেমার মূলধারায় সমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জায়গা করে নিতে পারেন।
এই সাফল্য তাকে ভারতের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।

‘টক্সিক: আ ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন-আপস’ যশের (KGF খ্যাত কন্নড় সুপারস্টার) নতুন সিনেমা, পরিচালনায় গীতু মোহনদাস। ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট।
নয়নতারার চরিত্র: এই সিনেমায় তিনি যশের চরিত্র ‘রায়া’র বোন ‘গঙ্গা’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
এটি একটি পিরিয়ড গ্যাংস্টার ড্রামা, গোয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্প। যশ নিজেই ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে নয়নতারাকে “the most badass sister anyone could have” বলে প্রশংসা করেন,
এবং জানান যে ব্যস্ত সময়সূচি সত্ত্বেও তিনি এই সিনেমায় কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন।
অ্যাকশন নিয়ে: টিজার-ট্রেলারে নয়নতারাকে মোটরসাইকেলে চড়ে দাপুটে, ফিয়ার্স ভঙ্গিতে দেখা গেছে।
সিনেমাটি স্টাইলিশ অ্যাকশন সিকোয়েন্স ও উচ্চমাত্রার সহিংসতার জন্য আলোচিত, এবং মুক্তির পর সমালোচকরা লিখেছেন, নয়নতারার “aura” বড় পর্দায় দেখাটাই ছিল সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ।
কিয়ারা আদভানি, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্তের মতো তারকারাও এতে আছেন, ফলে কাস্টিং হিসেবেও এটি বেশ বড় মাপের প্রজেক্ট।
ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যবসা
দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর নয়নতারা ২০২২ সালের ৯ জুন পরিচালক বিঘ্নেশ শিবানকে বিয়ে করেন মহাবলিপুরমে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে। বিঘ্নেশ শিবানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল ২০১৫ সালের সিনেমা ‘নানুম রাউডি দান’-এর শুটিংয়ের সময়,
যা পরবর্তীতে দীর্ঘ সম্পর্কে রূপ নেয়। বিয়ের কিছু মাস পরই, ২০২২ সালের অক্টোবরে সারোগেসির মাধ্যমে তারা জমজ পুত্রসন্তানের বাবা-মা হন, যাদের নাম রাখা হয় উয়ির ও উলাগ।
অভিনয়ের পাশাপাশি নয়নতারা একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রাউডি পিকচার্স’ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা জগতে একটি পরিচিত নাম।
এছাড়া ২০২৩ সালে স্বামী বিঘ্নেশ শিবান ও উদ্যোক্তা ডেইজি মরগানের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি চালু করেন স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড ‘9Skin‘, যা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতের বাজারে প্রিমিয়াম স্কিনকেয়ার পণ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে রিলায়েন্স রিটেইলের বিউটি প্ল্যাটফর্ম ‘টিরা’র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্র্যান্ডটি আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছায়। এর বাইরেও ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. রেনিতা রাজানের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘দ্য লিপ বাম কোম্পানি’ নামে আরেকটি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত আছেন।

উপসংহার
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার শীর্ষে টিকে থাকা নয়নতারার গল্প নিছক একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি ইন্ডাস্ট্রির ধারা বদলে দেওয়ার গল্প।
নায়ককেন্দ্রিক সিনেমা জগতে একক নায়িকা হিসেবে সিনেমা হিট করানো থেকে শুরু করে বলিউডে সফল পদার্পণ, ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া কাটিয়ে বারবার শীর্ষে ফেরা এবং সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা, প্রতিটি ধাপেই নয়নতারা প্রমাণ করেছেন প্রতিভা ও দৃঢ়তার সমন্বয়ে কীভাবে প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে ফেলা যায়।
তার এই যাত্রা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারী অভিনয়শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন, তারকাখ্যাতি কোনো পুরুষ সহশিল্পীর ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং নিজের যোগ্যতা দিয়েই অর্জন করা সম্ভব।













