সালমান শাহর লাশ উত্তোলন

নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের ধ্রুবতারা, প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃত্যুর দীর্ঘ ৩০ বছর পর তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে এক ঐতিহাসিক আদেশ দিয়েছেন আদালত। সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে নতুন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এই যুগান্তকারী আদেশ দেন। সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ বুধবার (১০ জুন ২০২৬) গণমাধ্যমকে আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.) মাজার থেকে তোলা হবে দেহাবশেষ

সিআইডি পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ জানান, হত্যার প্রকৃত কারণ ও ফরেনসিক তথ্য উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের আবেদন করা হয়েছিল, যা আদালত মঞ্জুর করেছেন। আইনি ও প্রশাসনিক কিছু দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণ কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল ও পুনরায় ময়নাতদন্তের কাজ শুরু করবে সিআইডি।

রমনা থানায় অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা: নেপথ্যের ইতিহাস

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার বাসা থেকে সালমান শাহর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তখন রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। তবে সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই এটিকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিল।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে এটিকে ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এজহারে স্বজনদের সেই গা শিউরে ওঠা বর্ণনা

মামলার এজহারে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় দেখা করতে যান। তখন সালমানের স্ত্রী সামীরা হক ও কর্মচারী আবুল জানান সালমান ঘুমাচ্ছেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফোন পেয়ে তারা দ্রুত বাসায় ফিরে দেখেন-

“সালমান শাহ শয়নকক্ষে খাটের উপরে মরার মতো নিথর পড়ে আছেন এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারা সালমানের গলায় স্পষ্ট দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে রহস্যজনক নীলচে দাগ দেখতে পান।”

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা সালমানকে মৃত ঘোষণা করেন। সালমানের বাবা জীবদ্দশায় ১৯৯৭ সালেই আদালতে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের আবেদন জানিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর এখন তাঁর মামা মামলাটি পরিচালনা করছেন।

আসামির তালিকায় সামীরা, আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও ডন

আলোচিত এই হত্যা মামলায় মোট ১১ জনকে নামধারী আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন: ১. সালমানের স্ত্রী সামীরা হক ২. চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাই ৩. লতিফা হক লুছি ৪. চিত্রনাট্যের খলনায়ক ডন ৫. ডেবিট ৬. জাভেদ ৭. ফারুক ৮. মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি ৯. আব্দুস সাত্তার ১০. সাজু ১১. রেজভি আহমেদ ফরহাদ

মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, এজাহারনামীয় বা অজ্ঞাতনামা আসামিদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে এই দেহাবশেষ পরীক্ষা ও নতুন ময়নাতদন্তের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই সেলিব্রিটি মৃত্যুরহস্যের জট খুলবে বলে আশা করছেন কোটি ভক্ত।