ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয় করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) অন্তত দুবার গোপন সফর করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (WSJ) একটি নতুন প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এই গোপন সফরগুলো সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার গভীরতা প্রকাশ করছে।
গোপন সফরের বিস্তারিত তথ্য
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরব কর্মকর্তা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে অন্তত দুবার আবুধাবি সফর করেন। সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করা।
একই সময়ে ইসরায়েলের যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল আমির বারামও আমিরাতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান নিউজ জানিয়েছে, ইসরায়েল সিকিউরিটি এজেন্সি (শিন বেত)-এর প্রধান ডেভিড জিনিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আমিরাত সফর করেছেন।
আমিরাতের সক্রিয় ভূমিকা ও গোপন হামলা
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেও ইরানের ভূখণ্ডে গোপন হামলা চালিয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের লাভান দ্বীপের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে হামলা চালায় আমিরাতি বাহিনী।
গত মাসে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমসহ অপারেটরদের গোপনে মোতায়েন করেছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর আমিরাত জরুরিভিত্তিতে ইসরায়েলের কাছে সাহায্য চেয়েছিল বলে জানা গেছে।
ইরানের কঠোর অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- আমিরাতের ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে ঘাঁটি দেওয়া
- ইরানি ব্যক্তি ও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ
- ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় নিজস্ব বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান
৪০ দিনব্যাপী যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় ইরানি সশস্ত্র বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান এবং ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চলে ১০০টিরও বেশি তরঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে — যেকোনো দেশ যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সহায়তা করে, তাহলে তাদেরকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরায়েল-আমিরাত সম্পর্ক
২০২০ সালে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর থেকে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সামরিক, গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উভয় দেশই ইরানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক গোপন সফর ও সহযোগিতা এই সম্পর্কের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোনো আগ্রাসন মেনে নেবে না এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও তার মিত্ররা বলছে, ইরানের নয়কি কর্মকাণ্ড রোধ করতে এ ধরনের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই গোপন সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতের বীজ বপন করতে পারে।
সূত্রঃ প্রেস টিভি










