কক্সবাজারে প্রায় প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। পুলিশের তথ্য বলছে, গত দুই সপ্তাহে কক্সবাজারে ১৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৮টিরও বেশি। এরমধ্যে গত ৫ দিনে ৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।

এসব ঘটনায় বেশির ভাগ অভিযুক্তরাই রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অপরাধী কিংবা তাদের গডফাদারদের সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সখ্যতার কারণে অপরাধীরা আইনের হাতে না আসায় বার বার এমন ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সার্বিক জননিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে সাধারণ মানুষ।

পুলিশের তথ্য মতে, গত দুই সপ্তাহে কক্সবাজারে ১৩ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৮টিরও বেশি। এরমধ্যে গত ৫ দিনে ৭ জন হত্যার শিকার হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্রও এক। গুলি কিংবা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা ক্যাম্পে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মাঝে, গত সোমবার সকালে সদরের চৌফলদণ্ডী ব্রিজের নিচ থেকে মো. সায়েম (২২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর কারণ এখনো অজানা। একই সময়ে কক্সবাজারের ঈদগাঁহ-এ সেহেরি খেয়ে নামাজের জন্য বের হয়ে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুন হয় তারেকুল ইসলাম (১৭) নামের এক দোকানি। সে ইসলামাবাদ ইউনিয়নের ওয়াহেদুর পাড়া এলাকার মৃত ছগির আহমদের ছেলে। তার হত্যাকারীকেও শনাক্ত করা যায়নি।

গত ৪ এপ্রিল পিএমখালীতে ফুটবল খেলার প্রাইজমানির টাকার ভাগভাটোয়ারার জের ধরে মো. জাহাঙ্গীর (২২) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। সে পিএমখালী ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম জুমছড়ি এলাকার ছৈয়দুল হকের ছেলে। ৪ এপ্রিল বিকেলে তাকে ছুরিকাঘাত করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে তার মৃত্যু হয়। ৭ এপ্রিল সদরের পিএমখালীতে পানি সেচ প্রকল্পের বিবাদকে কেন্দ্র করে মোরশেদ আলী ওরফে মোরশেদ বলী (৩৮) কে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ইফতারি অনুষঙ্গ কিনতে চেরাংঘর বাজারে গেলে দুর্বৃত্তরা লোহার রড, ছুরি ও লাঠি নিয়ে মোরশেদের উপর হামলে পড়ে। প্রায় ২০ মিনিট উপর্যুপরি আঘাতের পর হামলাকারীরা চলে গেলে স্থানীয়রা মুমূর্ষু অবস্থায় মোরশেদকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করলেও মূলহোতাদের এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। ৮ এপ্রিল চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের মইক্কাঘোনা পাহাড়ী এলাকায় মোবাইলে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ ইউনুছ (৪০) নামের এক যুবককে মেরে ফেলা হয়েছে।

গত ২৮ মার্চ কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজছাত্র রিদুয়ান ছিদ্দিকী। রিদুয়ান সিটি কলেজ এলাকার বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম মহসীন কলেজের ছাত্র। এই ঘটনায় র‍্যাব ও পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে।

গত দুই সপ্তাহে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী পুরুষসহ ৫ জন খুন হয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতি দিন থেকে দিন ভয়াবহতায় রূপ নিচ্ছে। বেশির ভাগ মামলার আসামী এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনালের আমগাছ তলা এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আবুল কালাম (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত কাউকে আটক করতে না পারলেও পুলিশ রাতে সাড়াশি অভিযান চালিয়ে ১০জনকে আটক করেছে। তারা পেশাদার ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম।

সচেতন মহল বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোচ্চার থাকলে কোনোদিন একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে না। সম্প্রতি কক্সবাজারের একাধিক হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে বলে মনে করছেন তারা। দিন-রাত খুন খারাবি থেকে জেলাবাসীকে নিস্তার পেতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সোচ্চার ও সজাগ থাকতে হবে বলে অভিমত তাদের। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলে বাকি অপরাধীরা অপরাধ করতে ভয় পাবে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে রিদুয়ান ও মোরশেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাকি ঘটনায়ও যারা জড়িত তাদের বিষয়ে কাজ করছে পুলিশ। ইতোমধ্যে ১৯ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শহরের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১২ দিনে ১৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। এগুলোর অধিকাংশ পারিবারিক ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক। সে হিসেবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে, ছিনতাইকারীদের দ্বারা খুন খুবই দুঃখজনক। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে ধরার জন্য পুলিশের অভিযান সর্বদা অব্যাহত রয়েছে। যেখানে অপরাধ সংঘঠিত হয় সেখানেই দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে।

সূত্রঃ ইত্তেফাক