জলসিঁড়িতে ছাত্রের মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত
banner

পূর্বাচল জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি ক্যাম্পাসের ভেতরেই সিএনজি বা স্কুলবাসের চাকা পিষ্ট হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে শাহরিয়ার সায়ন (৭) নামের দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী।

গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ছুটির সময়ে স্কুলের ক্যাম্পাসের ভেতরেই মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটে।

তবে দুর্ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে স্কুল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, সন্তানহারা শোকার্ত পিতাকে ভয়ভীতি ও শর্ত দিয়ে মামলা না করার মুচলেকা (অনাপত্তিপত্র) লিখে নিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে কতৃপক্ষ।

অধ্যক্ষের কক্ষে লাশের দর কষাকষি ও মুচলেকা

প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিভাবক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুর বা বিকালের দিকে সায়ন বাসের নিচে পড়ে মারা যায়। দুর্ঘটনার পর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শিশুটির নিথর দেহ ক্যাম্পাসের ভেতরেই পড়ে ছিল।

সায়নের বাবা সাজু আহম্মেদ সন্তানের মৃতদেহ দেখতে চাইলে তাকে প্রথমে লাশের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি, বরং সোজা নিয়ে যাওয়া হয় অধ্যক্ষের কক্ষে।

অভিযোগ উঠেছে, অধ্যক্ষের কক্ষে প্রথমে টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি রফা করার চেষ্টা চালানো হয়। তাতে সায়নের বাবা রাজি না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।

বলা হয়-

পুলিশি ঝামেলা বা ময়নাতদন্ত এড়াতে কর্তৃপক্ষের চাহিদামতো অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর এবং ফৌজদারি মামলা না করার শর্ত মেনে নিলেই কেবল লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হবে। শেষপর্যন্ত নিরুপায় সন্তানহারা পিতা স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুত করা মুচলেকা পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

অভিভাবকদের দাবি, স্কুলের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফুল ইসলাম খান ও অধ্যক্ষ লেঃ কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফেরদৌস হাসান টিটোর নির্দেশে কয়েকজন দায়িত্বশীল এই অপকর্মটি সম্পাদন করেন।

চালকের বেপরোয়া গতি ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতি

ঘটনাটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা জানান, ঘটনাটি ঘটেছে খোদ স্কুল ক্যাম্পাসের ভেতরে, যেখানে চলন্ত বাসে কোনো শিশুর ওঠার প্রশ্নই আসে না।

সায়ন বাসের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। অত্যন্ত ধীরগতিতে বাস চালানোর নিয়ম থাকলেও চালক কত দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল যে পেছনে থাকা একটি ছোট্ট শিশুকে এভাবে চাকার নিচে পিষে ফেলল।

অভিভাবকরা আরও অভিযোগ করেন, আদমজী ক্যান্টনমেন্টের বাস চালক ও হেলপারদের আচরণ দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত। হেলপারদের সার্বক্ষণিক মোবাইল আসক্তি ও চালকদের উগ্র গাড়ি চালানো নিয়ে বহুবার মৌখিক অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

কিছুদিন আগেও তাদের একটি বাস বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় শিক্ষার্থীসহ খাদে পড়ে গিয়েছিল। এমনকি ছুটির সময়ে আলসেমি করে স্কুলের দুটি প্রধান গেটের বদলে মাত্র একটি গেট খোলা রাখা হয়, যার কারণে মারাত্মক ভিড় ও জটের সৃষ্টি হয়।

সেনাসদর ও সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি

ক্যাম্পাসের মতো সুরক্ষিত জায়গায় একজন শিক্ষার্থীর এই মৃত্যুকে কোনো স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়, বরং ‘অবহেলাজনিত হত্যা’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ অভিভাবকরা। সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিচারের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে কি না- তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

ক্ষুব্ধ সচেতন নাগরিক ও অভিভাবক সমাজ একযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেনাসদর শিক্ষা পরিদপ্তরসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্ত চালক-হেলপার এবং ঘটনা ধামাচাপায় জড়িত প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।