জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত প্রতিবেদন

১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের গোপন প্রতিবেদন ৪৫ বছর পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসেছে।

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় নিখোঁজ থাকা এই বিচারবিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের মূল কপি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসার পর উন্মোচিত হয়েছে ইতিহাস কাঁপানো ওই ট্র্যাজেডির নানা অজানা ও বিস্ফোরক তথ্য।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ৬ জুন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন।

সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ মোট ৬২ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করে প্রতিবেদন তৈরি করলেও তা এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত প্রতিবেদন
প্রতিবেদনে থাকা ফ্লোর ডায়াগ্রামের পুনঃচিত্রায়ন। ছবি: সংগৃহীত

‘ভিনি, ভিডি, ভিচি’: প্রতিরক্ষাহীন ছিল রাষ্ট্রপতির আবাসস্থল

তদন্ত কমিশনের মূল পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেদিন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থা ও বাহিনীর ভূমিকা ছিল চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও শিথিল।

সার্কিট হাউসে পুলিশ ও প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) পর্যাপ্ত সশস্ত্র সদস্য থাকলেও হামলার সময় কোনো কার্যকর প্রতিরোধই গড়ে তোলা হয়নি।

কমিশন মন্তব্য করে, বিদ্রোহী ঘাতকদের জন্য পুরো আক্রমণটি ছিল ‘ভিনি, ভিডি, ভিচি’- অর্থাৎ এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

ভোর পৌনে ৪টার দিকে মাত্র ১৪-১৬ জন সেনাসদস্য কমান্ডো কায়দায় রকেট ও গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ চালায়। গুলির শব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দরজা খুলে বের হয়ে কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন,

“তোমরা কী চাও?” কোনো উত্তর না দিয়ে ঘাতকরা স্টেনগান দিয়ে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টে রাষ্ট্রপতির শরীরে ২০টি পৃথক গুলির ক্ষত পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

আরো পড়ুন- “রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে সরানো হবে জিয়াউর রহমানের কবর”

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত প্রতিবেদন
জিয়াউর রহমান হত্যায় যে সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসি হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

সহকারীদের রহস্যজনক আচরণ ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা

প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমানসহ কয়েকজন সহকারী কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

মাহফুজুর রহমান ঘটনার রাতে রাষ্ট্রপতির কক্ষের প্রহরীদের সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকায় কোনো যোগাযোগ না করে নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পাশাপাশি ডিজিএফআই ও এনএসআইসহ শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের এই অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আগাম তথ্য দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত প্রতিবেদন
ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নিহত রাষ্ট্রপতির জানাজায় মানুষের ঢল। সূত্র: বাংলাদেশ অবজার্ভার, ৩ জুন, ১৯৮১।ছবি: সংগৃহীত

মরদেহ গুম ও পাহাড় থেকে উদ্ধার

হত্যাকাণ্ডের পর সকালে সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির মরদেহ পড়ে থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন বা সেনা কর্মকর্তারা লাশের নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

পরবর্তীতে ১ জুন বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে রাঙ্গুনিয়ার পাথরঘাটা গ্রামের পাহাড়ি এলাকার এক গণকবর থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ঢাকায় এনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে ক্রিসেন্ট লেকের পাশে দাফন করা হয়।

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত প্রতিবেদন

কমিশন সিদ্ধান্ত টেনেছে যে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল গোয়েন্দা ব্যর্থতা, অসতর্কতা এবং প্রশাসনিক চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতার করুণ সম্মিলন।

সূত্র: ডেইলি স্টার