পল্লবীতে শিশু হত্যায় মৃত্যুদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এক চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো দেশের বিচার বিভাগ। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে হত্যার দায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ রোববার (৭ জুন ২০২৬) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। ধর্ষণ ও হত্যা—উভয় অভিযোগে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় স্বামী-স্ত্রী দুজনকে এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়।

কাঠগড়াতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন দম্পত্তি

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল পৌনে ৯টায় কঠোর নিরাপত্তায় কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে ঢাকা মহানগর আদালতে আনা হয়। এরপর বেলা ১১টা ৫ মিনিট থেকে ১১টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ মিনিট ধরে রায়ের বিবরণী পাঠ করেন বিচারক। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনার পরপরই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দুই আসামি উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করেন। রায়কে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।

পাশের ফ্ল্যাটেই ঘটেছিল সেই পৈশাচিক ঘটনা

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে স্কুলপড়ুয়া ওই শিশুটির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে এবং মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে খুনি সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই অবস্থান করছিলেন, যাকে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করার পর মূল ঘাতক সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

৫ দিনে চার্জশিট, মাত্র ১ দিনে ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ!

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করতে অনন্য তৎপরতা দেখিয়েছে পুলিশ ও আদালত:

  • তদন্ত সম্পন্ন: ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান।
  • বিচার শুরু: অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দিনই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয় এবং গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
  • রেকর্ড সাক্ষ্যগ্রহণ: গত ২ জুন মাত্র একদিনের মধ্যে মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করেন আদালত।
  • যুক্তিতর্ক ও রায়: ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আজ ৭ জুন (হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৯তম দিনে) এই রায় দেওয়া হলো।

মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু এবং ঢাকা মহানগর জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ। দ্রুততম সময়ে এই দৃষ্টান্তমূলক রায়ের ফলে সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের মাঝে সন্তোষ দেখা গেছে।

সূত্র: সমকাল