ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গণভোটে বড় ধরণের জনসমর্থন পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পক্ষে দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে ‘হ্যাঁ’ ব্যালটে সিল মেরেছেন। ঢাকার ১০৬টি কেন্দ্রের প্রাথমিক ফলাফলেই এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে।
গণভোটের প্রাথমিক ফলাফল (বেসরকারি):
ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসনের ১০৬টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে:
- ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৬৯,৩৪৭টি (৭৭.৬%)
- ‘না’ ভোট: ১৯,৯৪৫টি (২২.৪%)
সারাদেশের সার্বিক ট্রেন্ড বলছে, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, এই গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তার পক্ষেই রায় দিয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যে ১০টি বড় পরিবর্তন আসছে:
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার অর্থ হলো, নবনির্বাচিত সংসদ পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই পরিবর্তনগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য থাকবে:
১. উচ্চকক্ষ গঠন: জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠিত হবে। এর আসন বণ্টন হবে সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। ২. প্রধানমন্ত্রী পদের সময়সীমা: কোনো ব্যক্তি জীবনে ২ মেয়াদের বেশি (সর্বোচ্চ ১০ বছর) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। ৩. এক ব্যক্তির দুই পদ নয়: প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। ৪. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি: মানবাধিকার, তথ্য ও আইন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগগুলো রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই করতে পারবেন। ৫. ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন: অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। ৬. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার: সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি বাধ্যতামূলকভাবে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবে। ৭. গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: এখন থেকে সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। ৮. বিচার বিভাগীয় সংস্কার: প্রধান বিচারপতি নিয়োগ সরাসরি আপিল বিভাগ থেকে করা হবে এবং হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে কমিশনের ক্ষমতা বাড়বে। ৯. মৌলিক অধিকার সুরক্ষা: জরুরি অবস্থাতেও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। ১০. ক্ষমা প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতা: রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার বা ব্যক্তির সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একনায়কতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। যদিও বিএনপি এই সনদের কিছু বিষয়ে (বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা) দ্বিমত পোষণ করেছে, তবে গণরায়ের পর তা কার্যকর করা নতুন সরকারের জন্য নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে।







